অনার্স ১ম বর্ষ বাংলাদেশের ইতিহাস অধ্যায়-৭ গাইড PDF

Ahsan

অধ্যায়-৭ অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর ইতিহাস

অনার্স ১ম বর্ষ বাংলাদেশের ইতিহাস অধ্যায়-৭ গাইড PDF

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (National University) অনার্স ১ম বর্ষের Honours 1st year শিক্ষার্থীদের জন্য আজকের বিশেষ আয়োজনে থাকছে "বাংলাদেশের ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়" (History of Bangladesh: Language, Culture & Identity) বিষয়ের অধ্যায়-৭ অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর ইতিহাস -এর সম্পূর্ণ গাইড পিডিএফ। বাংলাদেশের মূলধারার জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি এদেশের সমতল ও পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলো এদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। এই অধ্যায়ে চাকমা, মারমা, গারো, সাঁওতালসহ বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সমাজকাঠামো, ধর্ম এবং বিদ্রোহের ইতিহাস আলোচনা করা হয়েছে।

পরীক্ষার সেরা প্রস্তুতির জন্য আমরা এই অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ  রচনামূলক প্রশ্নগুলো উত্তরসহ সাজিয়েছি। যারা অনার্স ১ম বর্ষের এই বিষয়ের অধ্যায়-৬ এর গাইডটি অনলাইনে পড়তে বা পিডিএফ (PDF) ডাউনলোড করতে চান, তাদের জন্য পোস্টের একদম শেষে ডাউনলোড লিংক দেওয়া হয়েছে। চলুন, মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে এই অধ্যায়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর দেখে নেওয়া যাক।

প্রশ্ন ৷৷৭.০১৷৷ বাঙালি জাতির নৃতাত্ত্বিক গঠন প্রকৃতি আলোচনা কর। অথবা, বাংলাদেশের জনগণের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় দাও। অথবা, বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক পটভূমি আলোচনা কর। অথবা, বাঙালি জাতির নৃতাত্ত্বিক গঠন ও বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর।

উত্তর :ভূমিকা : পৃথিবীর যেকোনো সমাজব্যবস্থায় নৃতাত্ত্বিক ধারণা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। বাঙালি জাতির নৃতাত্ত্বিক ধারা জটিল প্রকৃতির। বাঙালি কোনো একক নরগোষ্ঠী থেকে উৎপত্তি হয়নি। কতিপয় নরগোষ্ঠীর মিলিত ফল বাঙালি। বাঙালির নৃগোষ্ঠীর ভিন্ন ভিন্ন চেহারা পরিলক্ষিত হয়। বাঙালির আকার মাঝারি, তবে ঝোঁক খাটোর দিকে, চুল কালো, চোখের মণি হালকা থেকে ঘন বাদামি। বাংলা ভাষা মানুষকে নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলা যায় বাঙালি জাতি।

বাঙালি জাতির নৃতাত্ত্বিক পটভূমি : বাংলাদেশের মানুষের বসবাস কখন থেকে শুরু তা জানার কোনো সুস্পষ্ট ইতিহাস নেই। বাঙালি জাতি সম্পর্কে নৃতাত্ত্বিকদের ধারণা এটি একটি মিশ্রিত জাতি এবং এ অঞ্চলে বসবাসকারী আদিমতম মানবগোষ্ঠীর অন্যতম। পৃথিবীর বহু জাতি বাংলায় প্রবেশ করেছে এবং বসতি গড়ে তুলেছে। আবার এখান থেকে চলেও গেছে। ফলে বাঙালির রক্তে মিশেছে বহু এবং বিচিত্র নরগোষ্ঠীর অস্তিত্ব। সুনির্দিষ্ট মানবজীবনের অস্তিত্বহীনতা বিভিন্ন নরগোষ্ঠীর বসবাস ও সংমিশ্রণে এবং বহিরাগতদের আগমন ও প্রভাবের কারণে অতীতে এদেশের জনগোষ্ঠীর একটি কাঠামোগত নৃতাত্ত্বিক পরিচিতি রূপায়ণ সম্ভব হয়নি। নিম্নে বাঙালি জাতির নৃতাত্ত্বিক পটভূমি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :

১. আদি অস্ট্রালয়েড : বঙ্গদেশে আদি অস্ট্রালয়েড-এর নিকটতম প্রতিনিধি হিসেবে মুণ্ডা, মালে, খারিনা, ওঁরাও সাঁওতাল ও মাল পাহাড়িয়াদের চিহ্নিত করা যেতে পারে।

২. দ্রাবিড় উপাদান : দ্রাবিড় উপাদান বাঙালি জাতির মধ্যে প্রতিনিধিত্বমূলক। দ্রাবিড় জাতির বিশুদ্ধ কোনো জনগৌষ্ঠী পাওয়া না গেলেও মধ্যম নাসাকৃতি, দীর্ঘ শিরস্কতা ও মোটামুটি সুন্দর অবয়বের বৈশিষ্ট্যকে দ্রাবিড় হিসেবে গণ্য করা হয়। রিয়াল ও অন্যান্যদের সংগৃহীত উপাদান থেকে দেখা যায় যে, হিন্দু জাতির মধ্যে মাহিষ্য, মুচি, বাগদি, রাজবংশী, ক্ষত্রিয় এবং মুসলমানদের মধ্যেও এ বৈশিষ্ট্যের আধিক্য দৃষ্ট হয়।

৩. আর্য উপাদান : ইন্দো ভূমধ্য দীর্ঘ শিরস্ক উপাদানগুলো আমাদের মধ্যে দেখা যায়। বাঙালি হিন্দুদের মধ্যেও গোয়ালা, মুচি, রাজবংশী, ক্ষত্রিয় ও ব্রাহ্মণ দেখা যায়।

৪. মঙ্গলীয় উপাদান : বাঙালিদের মধ্যে দীর্ঘশিরস্কৃতির সামান্য অবদান সম্ভবত দীর্ঘ শিরস্ক মঙ্গলীয় গণ থেকে এসেছে। এ উপাদানগুলো ময়মনসিংহবাসী গারো জনগণ, বগুড়া, ময়মনসিংহের কোচ ও হাজংদের মধ্যে এ ধরনের বৈশিষ্ট্যের কিছুটা ঝোঁক পরিলক্ষিত হয়। বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর সাথে মিশে বাঙালি একটি সংকর জাতিতে পরিণত হয়েছে। আর্যদের সাথে সাঁওতাল, গারো, মুণ্ডা ইত্যাদির সংমিশ্রণ ঘটেছে। পামির, শক, তুর্কিয়ে, পাঠান, ইরানি, আরবসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রভাব বাঙালিদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়। বহিরাগত জনগোষ্ঠী ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং জনতাত্ত্বিক ক্ষেত্রে নতুন নতুন সংমিশ্রণ ও সংযোজন হয়।

বাঙালি জাতির নৃগোষ্ঠীগত পরিচয় সম্পর্কে মনীষীদের উক্তি : বাঙালির নৃগোষ্ঠীগত পরিচয় প্রদানে বিভিন্ন মনীষী বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করেছেন। তাদের এ দৃষ্টিভঙ্গি নিম্নে আলোচিত হলো :

১. হান্টারের অভিমত : হান্টার বাঙালি নৃগোষ্ঠীদের পরিচয় প্রদানে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ অভিমত প্রদান করেছেন। হান্টার তার লেখা Annals of Rural Bengal এবং The Indian Musalman গ্রন্থে বলার চেষ্টা করেছেন যে, এ দেশের মুসলমানরা উচ্চবর্ণের হিন্দু এবং বাকি সব বৌদ্ধধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়েছে। তার এ মতামত অনেকেই সমর্থন করেন না। কারণ তাদের মতে, মুসলমানদের অধিকাংশ নিম্ন বর্ণের হিন্দু থেকে কনভার্ট হওয়া। বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে বিদেশি প্রভাব থাকলেও নৃতাত্ত্বিকভাবে তা প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি।

২. বিরাজ শঙ্কর : নৃতাত্ত্বিক পরিচয় দানে সবচেয়ে অগ্রবর্তী ভূমিকা পালন করেছেন বিরাজ শঙ্কর। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের জনগোষ্ঠীকে ছয়টি শ্রেণিতে বিভক্ত করেন। তার শ্রেণিবিভাগ অনুসারে বাঙালি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে দ্রাবিড়ীয়, আদি অস্ট্রেলীয়, মঙ্গোলীয় ও ককেশীয় এ চার ভাগে ভাগ করেছেন। দক্ষিণ ভারতে উৎপাদিত কতিপয় অনন্য উপাদানসহ ও বাংলা প্রধানত দ্রাবিড়ীয় শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এদের অধিকাংশ জনগণ সিলেট এলাকায় বসবাস করে। প্রধানত আদি অস্ট্রেলীয় থেকে আগত সাঁওতাল ও খাসিয়ারা বর্তমানে বাংলাদেশের নাচোল, পোরশা, হরিপুর ও বানিয়াচংয়ে দেখতে পাওয়া যায়। সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামে খাসিয়াদের বসতি রয়েছে। তাদের অধিকাংশই চা বাগানের শ্রমিক।

৩. হাটন-গুহের অভিমত : জে. এইচ. হাটন ও বি. এস. গুহ-এর মতে, ক্ষুদ্র ও প্রশস্ত মুখমণ্ডল, দীর্ঘ সুন্দরতর, বঙ্কিম বা কুঞ্জ নাক, বিবর্ণ শ্বেত থেকে তামাটে বাদামি গায়ের রং, চোখ হালকা বাদামি থেকে কাল চুল সোজা ও তরঙ্গায়িত জনগোষ্ঠী হচ্ছে বাঙালি, অসমীয়া, উড়িয়া, মহারাষ্ট্র ও গুজরাটি। এরা আলপাইন জনগোষ্ঠী। আর চাকমারা মঙ্গোলীয়। অনেকেই হাটন-গুহের এ মতের সাথে একমত পোষণ করেননি।

৪. রমা প্রসাদের উক্তি : বিখ্যাত মনীষী রমা প্রসাদ বলেন- গুজরাট ও মহারাষ্ট্রের পাশাপাশি বাঙালিদের মধ্যেও আলপাইন মানব ধারার প্রভাব রয়েছে। তিনি DR. S. Hutton-এর সাথে ঐকমত্য পোষণ করে বলেন, বাঙালি ও আলপাইন মানবগোষ্ঠীর মধ্যে শারীরিক বৈশিষ্ট্যের যথেষ্ট মিল ছিল। মূলত এখান থেকেই বুঝা যায় বাঙালি আলপাইন মানব গোষ্ঠীরই অংশ।

৫. হার্বাট রিজলের বক্তব্য : ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, এদের অধিকাংশ মাথা গোল, নাক মধ্য আকৃতি থেকে চওড়া এবং উচ্চতা মাঝারি। বাঙালিদের গায়ের রং শ্যামলা, কালো ও কিছুটা পীত বর্ণের। তিনি বাঙালিদের আকৃতি বৈশিষ্ট্যের মিল খুঁজে পেয়েছেন আলপাইনদের সাথে। তাইতো তিনি বলেছেন- Bengal itself was mostly mesatic ephalice and dolicho cepholism only appeus in some of dravian tribes.

৬. ফজলে রাব্বীর অভিমত : ফজলে রাব্বী তার বর্ণনায় বাঙালিদের নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর পরিচয় খুব সুন্দরভাবে দিয়েছেন। তিনি তাঁর হকিকাতে মুসলমান বাঙালি গ্রন্থে মত পোষণ করেছেন যে বাংলাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীতে তুর্কিয়ে, আফগান, আরবি, আবিসিনীয় ও ইরানীদের প্রভাব রয়েছে। ৭ম ও ৮ম শতকে এসব বহিরাগত মুসলিম ব্যবসায়ী চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও সিলেট অঞ্চলে প্রবেশ করে।

৭. নীহার রঞ্জন রায় : বাংলার ইতিহাসের অগ্রদূত ইতিহাসের প্রাণ পুরুষ নীহার রঞ্জন রায় বাঙালির নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর পরিচয় দিতে গিয়ে তাঁর বাঙালির ইতিহাস গ্রন্থে হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতির উৎপত্তি সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য প্রদান করেন। তিনি বলেন, অনেক রূপান্তর ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অস্ট্রেলীয় ও দ্রাবিড় নৃগোষ্ঠীর ধর্মীয় আচার বিশ্বাস হিন্দু সমাজে অনুপ্রবেশ করে। এতে বাঙালি হিন্দুদের নৃগোষ্ঠীগত পরিচয় ফুটে ওঠে। এদেশে নৃগোষ্ঠী গঠনে ঐসব আদি অস্ট্রেলীয় ও দ্রাবিড় প্রভাব বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তবে আর্যদের প্রভাবও একেবারে অস্বীকার করা যায় না। তিনি বলেন, বাঙালি জাতির গঠনে অস্ট্রেলীয় ও দ্রাবিড় জাতির সংমিশ্রণ ছিল।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, বিখ্যাত মনীষীদের বর্ণনা থেকে আমরা বুঝতে পারি বাঙালি জাতি নৃগোষ্ঠীগত বহু জাতির সংমিশ্রণের ফলে গড়ে উঠেছে। তারপরও স্বকীয় বৈশিষ্ট্য হিসেবে মনীষীরা বর্ণনা করেছেন যে, তাদের মাথা গোলাকৃতি, চুল কালো, চোখের মণি পাতলা থেকে ঘন বাদামি, মোটামুটি মাঝারি আকৃতির নাক পাতলা থেকে গাঢ় বাদামি চামড়া এবং মুখমণ্ডল মধ্য আকৃতির। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে বাঙালি জাতিকে আলাদা নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যে চেনা যায়। তবে বাঙালি জাতির মধ্যে আদি অস্ট্রেলীয় প্রভাব বিদ্যমান ছিল আর তাদের বৈশিষ্ট্যগুলো পরিলক্ষিত হয় সাঁওতাল ও বাঁও উপজাতি এবং কিছু সমতলবাসীর মধ্যে।

প্রশ্ন ৷৷৭.০২৷৷ বাঙালি সংকর জাতি আলোচনা কর।

উত্তর : ভূমিকা : বাঙালি একক কোনো নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী নয়। প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মিলন ও সমন্বয়ের মাধ্যমে বাঙালি জাতি গড়ে উঠেছে। ভারতীয় উপমহাদেশের জাতিগত পরিচয় নির্ধারণে যারা নিরলসভাবে কাজ করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন স্যার হার্বার্ট রিজলি, পণ্ডিত বিরাজশঙ্কর গুহ, রমাপ্রসাদ চন্দ্র প্রমুখ। পণ্ডিতদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মত হলো বাঙালি একটি নতুন মিশ্র জাতি।

বাঙালি সংকর জাতি : ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে প্রথম যে জনগোষ্ঠী বসবাস শুরু করে তারা নিগ্রোয়েড বা অস্ট্রালয়েড শ্রেণির অন্তর্গত। ধীরে ধীরে এদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দ্রাবিড়, আলপীয়, মঙ্গোলীয়, আর্য, আরব জাতি প্রভৃতি। আর্যরা বাংলায় আসে খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকের আগেই। এরপরও মিশ্রণ অব্যাহত থাকে। অনেকগুলো জাতির সমন্বয়ে বাঙালি জাতি গঠিত। এর মূল কাঠামো সৃষ্টির কাল প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে মুসলিম অধিকারের পূর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত। নিম্নে এ বিষয়ে আলোচনা করা হলো-

১. দ্রাবিড় : দ্রাবিড়রা এ দেশের আদি অধিবাসীদের মধ্যে অন্যতম। প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে এদেশে দ্রাবিড়রা প্রবেশ করে।

২. মঙ্গোলয়েড : গায়ের রং পীতাভ থেকে বাদামি, চুল কালো ও ঋজু, মাথার আকৃতি গোল, নাক চ্যাপ্টা, চোখের পাতা সামনের দিকে ঝোলানো। এ জনগোষ্ঠী দক্ষিণ-পশ্চিম চীন থেকে এ অঞ্চলে এসেছে। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রংপুর ও সিলেট অঞ্চলে এদের মূল বসবাস।

৩. আর্য বা ককেশীয় জনগোষ্ঠী : প্রোটো-অস্ট্রালয়েডদের পর ককেশীয়রা এদেশে প্রবেশ করে। এদেরকে আর্য বলা হয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বাংলাদেশের জনপ্রকৃতিতে আর্য ভাষাভাষী একটি ধারা এসে প্রভাবিত করে। আর্যরা দ্রাবিড়-ভেড্ডিডদের পদানত করে ভারতবর্ষে বর্ণপ্রথার জন্ম দেয়। শরীরের বলিষ্ঠ গড়ন, গৌরবর্ণ, লম্বাকৃতির মাথা, সরু নাক আর্যদের লক্ষণ।

৪. নর্ডিক : বাঙালি নৃমিশ্রণে অন্য জাতির নাম নর্ডিক। তারা বেদপন্থি আর্য ছিল। ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির উজ্জীবনে এদের অবদান অনেক বেশি। বেদ রচনার পর এদের উৎপত্তি হয়। বাংলা, গুজরাট ও মারাঠায় এদের অবস্থান পাওয়া যায়। এরা ভারতে এসে বন্যপশুদের পোষ মানিয়ে গৃহপালিত জীবে পরিণত করে। এরা ঘোড়া, মেষ, শূকর প্রভৃতি পশুপালন করত। এ জনগোষ্ঠী বাঙালি জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৫. নেগ্রিটো : খর্বাকৃতি, কৃষ্ণবর্ণ, বেঁটে, ঠোঁট পুরু ও উল্টানো এবং নাক অতি চ্যাপ্টা। নেগ্রিটো বাংলার জনগোষ্ঠীর প্রথম স্তর।

৬. অস্ট্রিক বা অস্ট্রালয়েড : মাথার গড়ন লম্বা, নাক চওড়া, গায়ের রং মিশমিশে কালো, উচ্চতা বেঁটে কিংবা মধ্যমাকার। এরা ভেড্ডিড ও নিষাদ নামেও পরিচিত। বাঙালির মধ্যে এ জনগোষ্ঠীর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ধারণা করা হয় ৫/৬ হাজার বছর আগে এরা এ অঞ্চলে আসে। সাঁওতাল, কোল, ভিল, মুণ্ডা, ভূমিজ, মালপাহাড়ি, বাউড়ি, চণ্ডাল প্রভৃতি আদি অস্ট্রিকদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কুড়ি, পণ, গণ্ডা প্রভৃতি হিসাব, চোঙ্গা, পেট, ঢোল, কলা, লাউ, লেবু, প্রভৃতি অস্ট্রিক ভাষার শব্দ।

৭. আরব জাতি : সপ্তম ও অষ্টম শতকে আরব জাতি বাংলায় আগমন করে। পরবর্তীতে তুর্কিয়ে, আফগান, হাবশি, ইরানি, মুঘল মুসলমানরা বাংলায় বসতি স্থাপন করে।

৮. ইউরোপীয় জাতি : ১৬ শতকে ইউরোপীয়রা এখানে এসে বাঙালি জাতি গঠনে অবদান রাখে। এরপর ইংরেজরা বাংলায় আগমন করে বাঙালির নৃমিশ্রণে ভূমিকা রাখে।

৯. আলপাইন : আলপাইন সম্প্রদায় দ্রাবিড়দের পরে ভারতে প্রবেশ করে। বাঙালি, গুজরাটি, মারাঠি, ওডিশি জাতির পূর্বপুরুষদের অনেকেই আলপাইন গোষ্ঠীর লোক ছিল। এরা বিহার, উড়িষ্যা হয়ে কাশী এবং পূর্ব আসামের কামরূপ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এদের থেকে বাঙালি জাতির বড়ো একটা অংশ আসে।

১০. আর্য পরবর্তী ধারা : আর্য জাতি ছাড়াও তাদের পরে আরও অনেক জাতি এ অঞ্চলে আগমন করে। তাদের সংমিশ্রণও বাঙালি জাতি গঠনে সহায়তা করে। পারস্যের তুর্কিস্তান থেকে সাকা জাতির লোকেরা ভারতে আগমন করে। ভারতে আসার পর তারা ভারতের পূর্বাঞ্চল ও বাংলায় বসতি স্থাপন করে। বাঙালি জাতির উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মতামত থাকলেও বাঙালি জাতির উৎপত্তি সম্পর্কে সঠিক কোনো তত্ত্ব পাওয়া যায়নি। বর্তমানে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে আর্থসামাজিক, পারিবারিক জীবনযাত্রা, আচার-অনুষ্ঠান সবকিছুতেই এক ধরনের সংমিশ্রণ পরিলক্ষিত হয়। তাই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, আলপীয় জনগোষ্ঠীর সাথে আর্য, মোঘল, আরব ও তুর্কিদের সংমিশ্রণে বাঙালি জাতির উদ্ভব হয় এবং বাঙালি একটি সংকর জাতি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, বাঙালি জাতির উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মতামত থাকলেও বাঙালি জাতির উৎপত্তি সম্পর্কে সঠিক কোনো তত্ত্ব পাওয়া যায়নি। বর্তমানে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে আর্থসামাজিক, পারিবারিক জীবনযাত্রা, আচার-অনুষ্ঠান সবকিছুতেই এক ধরনের সংমিশ্রণ পরিলক্ষিত হয়। তাই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, আলপীয় জনগোষ্ঠীর সাথে আর্য, মোঘল, আরব ও তুর্কিদের সংমিশ্রণে বাঙালি জাতির উদ্ভব হয় এবং বাঙালি একটি সংকর জাতি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

প্রশ্ন ৷৷৭.০৩৷৷ উপজাতি কারা? উপজাতির বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী?

উত্তর : ভূমিকা : বাংলাদেশে নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলোকে বুঝাতে “আদিবাসী”, “ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী” এবং “উপজাতি” এই তিনটি শব্দ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। তবে এগুলোর প্রতিটি ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক এবং আইনি তাৎপর্য বহন করে। এই শব্দগুলোর সংজ্ঞা ও ব্যবহারিক পার্থক্য বুঝা বাংলাদেশের নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য ও অধিকারবিষয়ক আলোচনাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

উপজাতি : 'উপজাতি' শব্দটি ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। এটি সাধারণত এমন জনগোষ্ঠীকে নির্দেশ করে যারা একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বসবাস করে, নিজস্ব সামাজিক কাঠামো, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য বজায় রাখে এবং অর্থনৈতিকভাবে বৃহত্তর সমাজ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। ঔপনিবেশিক আমল থেকে এই শব্দটি প্রশাসনিক ও জাতিগত শ্রেণিবিভাগে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। উপজাতি একটি জটিল সামাজিক, নৃতাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক ধারণা, যা কেবল একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় বসবাসকারী মানুষের গোষ্ঠীকে নির্দেশ করে না, বরং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক, সংস্কৃতি এবং বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে তাদের মিথস্ক্রিয়াকেও তুলে ধরে।

প্রামাণ্য সংজ্ঞা : Ralph Linton (1936), "A tribe is a group of bands occupying a contiguous territory or territories and having a feeling of unity deriving from numerous similarities in culture, frequent contacts and a certain community of interests."

A.L. Kroeber (1948), "Tribe is a group that possesses a territory, dialect, cultural homogeneity and unifying social organization, and that functions as a political unit."

জাতিসংঘের প্রেক্ষাপট (UN, ILO Convention 169), "Indigenous or tribal peoples are those whose social, cultural and economic conditions distinguish them from other sections of the national community and whose status is regulated wholly or partially by their own customs or traditions."

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO Convention 169), "উপজাতি বা আদিবাসী জনগোষ্ঠী হলো সেই সব জনগণ, যাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা মূলধারার জনগোষ্ঠী থেকে ভিন্ন এবং যাদের জীবনযাত্রা আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে নিজেদের প্রথা, রীতি ও ঐতিহ্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত"।

উপজাতির বৈশিষ্ট্য : নিম্নে উপজাতির বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচিত হলো :

১. সাধারণ বংশগত পরিচয় : উপজাতি সদস্যরা প্রায়শই একটি কাল্পনিক বা বাস্তব সাধারণ পূর্বপুরুষের বংশধর হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেয়। এটি তাদের মধ্যে এক ধরনের ভ্রাতৃত্ববোধ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরি করে।

২. ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা : বেশিরভাগ উপজাতিই ঐতিহাসিকভাবে মূল স্রোতের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলো বজায় রাখতে সাহায্য করে।

৩. স্বতন্ত্র ভাষা ও সংস্কৃতি : প্রতিটি উপজাতির নিজস্ব মৌখিক বা লিখিত ভাষা, বিশেষ রীতিনীতি, বিশ্বাস, উৎসব এবং জীবনধারা থাকে। এই সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য তাদের নিজেদের পরিচয়কে দৃঢ় করে।

৪. সরলপূর্ণ অর্থনীতি : ঐতিহাসিকভাবে উপজাতিদের অর্থনীতি সাধারণত শিকার, সংগ্রহ, পশুপালন বা জুম চাষ (shifting cultivation)-এর মতো সহজ কৃষিনির্ভর ব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। এই অর্থনীতি তাদের জীবনধারাকে বৃহত্তর সমাজের বাজারের চাহিদা থেকে দূরে রাখে।

৫. নির্দিষ্ট সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো : উপজাতিদের নিজস্ব সামাজিক সংগঠন থাকে, যা প্রায়শই প্রথাগত নিয়ম ও বয়োজ্যেষ্ঠদের দ্বারা পরিচালিত হয়। এখানে রাজনৈতিক ক্ষমতা বংশগত বা যোগ্যতাভিত্তিক হতে পারে।

৬. আত্মসচেতনতা : প্রতিটি উপজাতির সদস্যরা নিজেদের একটি একক গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করে এবং নিজেদের পরিচয়কে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, উপজাতি মূলত একটি স্বতন্ত্র সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, যা যুগ যুগ ধরে নিজস্ব ঐতিহ্য, ভাষা ও জীবনধারা বজায় রেখে এসেছে। তাদের সাধারণ পূর্বপুরুষের ধারণা, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও প্রথাগত অর্থনীতি তাদের সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে তোলে। একই সঙ্গে প্রথাগত সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামো ও আত্মসচেতনতা উপজাতিদের স্বকীয় পরিচয় টিকিয়ে রাখার মূল উপাদান। তাই উপজাতির বৈশিষ্ট্যগুলো শুধু তাদের ভিন্নতাকে নয়, বরং মানবসমাজের বহুমাত্রিক বৈচিত্র্যকেও প্রতিফলিত করে।


অনার্স ১ম বর্ষ বাংলাদেশের ইতিহাস ভাষা সংস্কৃতি ও পরিচয় অধ্যায়-৭ অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর ইতিহাস গাইড PDF

📥 PDF ডাউনলোড করুন

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!
Join