অনার্স ১ম বর্ষ বাংলাদেশের ইতিহাস অধ্যায়-৬ গাইড PDF (মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ অভ্যুত্থান)

Ahsan

অধ্যায়-৬ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং গণ-অভ্যুত্থান ২০২৪ পর্যন্ত [Liberation Movement of 1971 and Mass Uprising till 2024]

অনার্স ১ম বর্ষ বাংলাদেশের ইতিহাস অধ্যায়-৬ গাইড PDF (মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ অভ্যুত্থান)


জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (National University) অনার্স ১ম বর্ষের Honours 1st year শিক্ষার্থীদের জন্য আজকের বিশেষ আয়োজনে থাকছে "বাংলাদেশের ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়" (History of Bangladesh: Language, Culture & Identity) বিষয়ের অধ্যায়-৬ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং গণ-অভ্যুত্থান ২০২৪ পর্যন্ত -এর সম্পূর্ণ গাইড পিডিএফ।

পরীক্ষার সেরা প্রস্তুতির জন্য আমরা এই অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ  রচনামূলক প্রশ্নগুলো উত্তরসহ সাজিয়েছি। যারা অনার্স ১ম বর্ষের এই বিষয়ের অধ্যায়-৬ এর গাইডটি অনলাইনে পড়তে বা পিডিএফ (PDF) ডাউনলোড করতে চান, তাদের জন্য পোস্টের একদম শেষে ডাউনলোড লিংক দেওয়া হয়েছে। চলুন, মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে এই অধ্যায়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর দেখে নেওয়া যাক।

▣ পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণ

প্রশ্ন ৷৷৬.০১৷৷ পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক কাঠামো আলোচনা কর।

উত্তর : ভূমিকা : ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের কিছু বৈশিষ্ট্য ও সমস্যাবলি পর্যালোচনা করলেই এর কেন্দ্রীয় কাঠামোর প্রাথমিক চিত্রটি ফুটে ওঠে। তথাপি পাকিস্তান রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কাঠামোর পুনর্গঠন দৃশ্যমান হয় পাকিস্তান রাষ্ট্রের ১৯৫৬ ও ১৯৬২ সালের সংবিধানের ধারা বিশ্লেষণের মাধ্যমে। এর কেন্দ্রীয় কাঠামোতে গভর্নর জেনারেল, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ, কেন্দ্রীয় আইনসভা, বিচারবিভাগ ও প্রশাসনের কাঠামো ইত্যাদির মাধ্যমে প্রতীয়মান হয়।

❑ পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় কাঠামো : নিম্নে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার কাঠামো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :

১. প্রেসিডেন্ট : ১৯৫৬ সালের সংবিধান অনুযায়ী পাকিস্তান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রধান প্রেসিডেন্ট নামে অভিহিত হন। জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি নির্বাচনি সংস্থার মাধ্যমে তাকে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হতে হতো এবং কেউ দশ বছরের বেশি অর্থাৎ দুই বারের বেশি নির্বাচিত হতে পারবে না এমন বিধান ছিল। শাসনতন্ত্র লঙ্ঘন বা অসদাচরণের দায়ে প্রেসিডেন্টকে অভিযুক্ত করা যেত। কিন্তু ১৯৬২ সালের সংবিধানে বলা হয়, এক লক্ষ বিশ হাজার নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি নির্বাচক মণ্ডলীর দ্বারা পাঁচ বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন। এছাড়া তার কার্যকালের মধ্যে শুধু অভিশংসনের দ্বারাই তাকে তার পদ থেকে অপসারণ করা যাবে। প্রেসিডেন্ট সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন। তিনি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান প্রদেশের গভর্নর, সুপ্রিমকোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতিগণ এবং অ্যাটর্নি জেনারেল নিযুক্ত করেন।

২. মন্ত্রিপরিষদ : জাতীয় পরিষদ সদস্যদের মধ্য থেকে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত হতেন। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে প্রেসিডেন্ট অন্যান্য মন্ত্রী ও উপমন্ত্রী নিযুক্ত ও পদচ্যুত করতেন। মন্ত্রিগণ জাতীয় পরিষদের নিকট দায়বদ্ধ ছিলেন। তবে ১৯৬২ সালের সংবিধানে এ ব্যবস্থা রাখা হয় যে, জাতীয় পরিষদ বা প্রাদেশিক পরিষদসমূহের কোনো সদস্য প্রেসিডেন্টের মন্ত্রিসভার সদস্য নিযুক্ত হলে সঙ্গে সঙ্গে তার পরিষদের সদস্যপদ বাতিল হয়ে যাবে।

৩. কেন্দ্রীয় আইনসভা : পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় আইনসভা প্রেসিডেন্ট ও এক কক্ষবিশিষ্ট একটি পরিষদ নিয়ে গঠিত ছিল যা পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নামে পরিচিত। প্রথম দিকে ৩০০ সদস্য নিয়ে জাতীয় পরিষদ গঠিত ছিল এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সমসংখ্যক সদস্য গৃহীত হতো। পরবর্তীতে এর মোট সদস্য সংখ্যা ১৫৬ তে আনা হয় উভয় প্রদেশ হতে সমান সংখ্যক সদস্য নিয়ে। এর মধ্যে উভয় প্রদেশ হতে ৩টি করে মোট ৬টি আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। কমপক্ষে ২৫ বছর বয়স্ক পাকিস্তানের যেকোনো নাগরিক জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হতে পারতেন।

৪. সুপ্রিমকোর্ট : পাকিস্তানের বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ আদালত প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারপতিদের নিয়ে পাকিস্তান সুপ্রিমকোর্ট গঠিত হয়। প্রেসিডেন্ট কর্তৃক প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হন এবং তার সাথে পরামর্শক্রমে অন্যান্য বিচারপতি নিযুক্ত থাকতে পারতেন। কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে সুপ্রিমকোর্ট তা মীমাংসার এখতিয়ার রাখত। এছাড়া সুপ্রিমকোর্ট হাইকোর্টের রায়, আদেশ বা শাস্তির বিরুদ্ধে আপিল গ্রহণপূর্বক সিদ্ধান্ত প্রদান করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করত।

৫. কেন্দ্রীয় সচিবালয় : ব্রিটিশ ভারতের মতো পাকিস্তানেও সচিবালয় ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের সরকারি কার্যক্রমের স্নায়ুকেন্দ্র। সচিবালয়ের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়গুলোর সাথে সংযুক্ত ছিল কতগুলো সংশ্লিষ্ট বিভাগ, পরিদপ্তর। সরেজমিনে প্রশাসন পরিচালনার জন্য বিভাগ, জেলা ও মহকুমা। নীতিনির্ধারণ হয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বিভাগ ও পরিদপ্তরগুলো নীতিবাস্তবায়নে কার্যক্রম গ্রহণ করত। পাকিস্তানে কয়েকটি নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। যেমন- জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ, পরিকল্পনা কমিশন ইত্যাদি। নীতিনির্ধারণী বা মাঠ প্রশাসন পরিচালনার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ একক ছিল সি.এস. পি কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে। মন্ত্রণালয়ের মধ্যমণি ছিলেন মন্ত্রী। মন্ত্রী ছিলেন মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক প্রধান। মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী ও প্রশাসনিক প্রধান থাকতেন সচিব। মন্ত্রণালয়ের পরেই ছিল ডিভিশন, যার প্রধান ছিলেন একজন অতিরিক্ত সচিব বা একজন যুগ্ম সচিব। প্রত্যেক ডিভিশন আবার কয়েকটি শাখায় বিভক্ত ছিল। শাখার দায়িত্বে ছিলেন উপ-সচিবগণ। উপসচিবের অধীনে সহকারী সচিব, সহকারী সচিবই ছিলেন মন্ত্রণালয়ের সর্বনিম্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা।

❑ পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকার কাঠামো : নিম্নে পাকিস্তানের প্রাদেশিক কাঠামো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো- প্রদেশের শাসনভার অর্পণ করা হয়েছে গভর্নরের ওপর। প্রত্যেক প্রদেশে একজন করে গভর্নর প্রেসিডেন্ট কর্তৃক নিযুক্ত ছিলেন। তিনি প্রেসিডেন্টের নির্দেশে প্রেসিডেন্টের অনুকূলে কার্যসম্পাদন করতেন। তার এ কাজে তাকে একটি প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা সহায়তা করত। গভর্নর প্রাদেশিক পরিষদের মধ্য থেকে পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সমর্থনপুষ্ট ব্যক্তিকে মুখ্যমন্ত্রী নিযুক্ত করতেন এবং মুখ্যমন্ত্রীর সাথে পরামর্শক্রমে অন্যান্য মন্ত্রীদের নিযুক্ত করতেন। গভর্নর প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন আহ্বান, মূলতবি অথবা ভেঙে দিতে পারতেন। তার অনুমোদন ছাড়া কোনো বিল আইনে পরিণত হতে পারত না। তিনি অ্যাডভোকেট জেনারেল এবং প্রাদেশিক পাবলিক সার্ভিস কমিশন এর চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ করতেন।

১. প্রাদেশিক আইনসভা : ১৯৫৬ সালের সংবিধানে প্রত্যেক প্রাদেশিক আইনসভায় বা প্রাদেশিক পরিষদে ৩০০ সদস্যের সমন্বয়ে এক কক্ষবিশিষ্ট পরিষদের ব্যবস্থা ছিল। পাশাপাশি ১০ বছর পর্যন্ত ১০টি আসন মহিলা সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে ১৯৬২ সালের সংবিধানে প্রত্যেক প্রদেশের পরিষদের সদস্য সংখ্যা ১৫৬ তে নামিয়ে আনা হয়। প্রাদেশিক পরিষদের মেয়াদকাল ছিল ৫ বছর। পরিষদ সদস্যগণ নিজেদের মধ্য থেকে একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করতেন।

২. প্রাদেশিক সচিবালয় : কেন্দ্রীয় সচিবালয় ছিল যেমন সমগ্র দেশের প্রশাসনিক কেন্দ্রবিন্দু, তেমনি প্রাদেশিক সচিবালয় ছিল প্রাদেশিক প্রশাসনের মূল কেন্দ্র। প্রাদেশিক সচিবালয়েরও শীর্ষে ছিলেন প্রাদেশিক মন্ত্রী। প্রশাসনিক প্রধান ছিলেন সচিব। কেন্দ্রের মতো প্রাদেশিক মন্ত্রণালয়ও কয়েকটি বিভাগ, ডিভিশন ও শাখায় বিভক্ত ছিল। প্রাদেশিক সচিবালয়ে একজন মুখ্য সচিব ছিলেন, তিনি প্রশাসনিক ক্ষেত্রে সমন্বয়, তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণমূলক কাজ করতেন। সর্ব প্রশাসন পরিচালনার জন্য প্রতিটি প্রদেশ কয়েকটি বিভাগে বিভক্ত ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের ৪টি এবং পশ্চিম পাকিস্তানে ১২টি বিভাগ ছিল। প্রতিটি বিভাগ আবার কয়েকটি জেলায় বিভক্ত ছিল। জেলার অধীনে কতগুলো মহকুমা ছিল এবং থানার প্রশাসনিক প্রধান ছিলেন সার্কেল অফিসার (উন্নয়ন)।

প্রশ্ন ৷৷৬.০২৷৷ পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো আলোচনা কর।

উত্তর : ভূমিকা : ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয় দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে। যদিও ভারত গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের পথে অগ্রসর হয়, পাকিস্তান জন্মলগ্ন থেকেই একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র গঠনের দিকে মনোনিবেশ করে। রাষ্ট্রের নীতি, ক্ষমতার বণ্টন এবং প্রশাসনিক কাঠামোতে পাকিস্তান ভারত থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী চরিত্র ধারণ করে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, শক্তিশালী সামরিক বাহিনী, বেসামরিক আমলাদের ওপর নির্ভরতা এবং প্রদেশগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ- সব মিলিয়ে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো একটি অনন্য এবং জটিল বৈশিষ্ট্য লাভ করে।

❑ পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো : নিম্নে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ধরন কিরূপ ছিল, তা তুলে ধরা হলো-

১. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর একক আধিপত্য : পাকিস্তানের জন্মলগ্নে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর হাতে রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল। তিনি একাধারে গভর্নর জেনারেল, গণপরিষদের সভাপতি এবং মুসলিম লীগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার সিদ্ধান্ত ছিল চূড়ান্ত, যা রাষ্ট্রীয় নীতিতে স্বৈরাচারী প্রবণতার সূচনা ঘটায়। "Jinnah was not just the Governor-General; he was the state itself." - Stanley Wolpert, Jinnah of Pakistan.

২. শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর প্রভাব : পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ব্রিটিশ আমলের চৌকস সেনাদল থেকে গড়ে ওঠে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অধিকাংশ সদস্যই ছিল পাঞ্জাবি এবং পাঠান, ফলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, রাজনীতি ও প্রশাসনে সামরিক বাহিনীর প্রভাব দ্রুত বেড়ে যায়। এই প্রভাব পরবর্তীতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক কাঠামোকে সামরিক শাসনের দিকে ঠেলে দেয়। এর ফলে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। সেনাবাহিনীর এই আধিপত্য পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে, যা বাঙালিদের মধ্যে হতাশার জন্ম দেয়। সামরিক বাহিনীর অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগের কারণে বেসামরিক সরকারগুলো দুর্বল হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের প্রথম সামরিক শাসন জারি হয়।

৩. বেসামরিক আমলাদের প্রভাবশালী ভূমিকা : পাকিস্তানের জন্মলগ্নে উচ্চপদস্থ আইসিএস ও আইপিএস কর্মকর্তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন ব্রিটিশ, মোহাজের অথবা পশ্চিম পাকিস্তানি। বাঙালি আমলার সংখ্যা ছিল অত্যন্ত সীমিত। যেহেতু পাকিস্তানি রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্বাচিত ছিল না, তাই তারা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে এই আমলাদের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিল। এই আমলারা নিজেদের স্বার্থে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতেন, যা অনেক সময় জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেত। তাদের এই প্রভাবশালী ভূমিকা পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষমতায় আসতে বাধা দেয় এবং বৈষম্য আরও বাড়িয়ে তোলে। এই আমলাতান্ত্রিক আধিপত্য রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি করে এবং প্রশাসনের ওপর সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সহজ করে দেয়।

৪. দুর্বল নেতৃত্বের সংকট : মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও লিয়াকত আলী খানের মৃত্যুর পর পাকিস্তান নেতৃত্বের বড়ো সংকটে পড়ে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয় এবং প্রভাবশালী নেতৃত্বের অনুপস্থিত সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের পথ প্রশস্ত করে, যা ১৯৫৮ সালে প্রথম সামরিক শাসনের সূচনা ঘটায়। এই দুর্বল নেতৃত্ব রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করে এবং ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন হয়। এর ফলে কোনো সরকারই দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা বা নীতি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এই শূন্যতা এবং অস্থিতিশীলতা সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতা দখলের জন্য সুযোগ করে দেয়।

৫. দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট আইন পরিষদ : পাকিস্তানের আইন পরিষদ দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট ছিল— উচ্চ পরিষদ ও নিম্ন পরিষদ। নিম্ন পরিষদে জনসংখ্যার ভিত্তিতে সদস্য নির্বাচিত হলেও উচ্চ পরিষদে সমান প্রতিনিধিত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যাগত সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাজনৈতিকভাবে কার্যত নস্যাৎ করা হয়। এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করে এবং কেন্দ্রীয় সরকারে তাদের ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়। দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট এই ব্যবস্থা পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক আধিপত্যকে আরও শক্তিশালী করে তোলে, যা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করে।

৬. গণপরিষদে পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্য : গণপরিষদে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রাধান্য নিশ্চিত করতে পশ্চিম পাকিস্তানে আসন সংখ্যা বাড়ানো হয়। এর ফলে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ কার্যকরভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হয়। এই অসম আসন বণ্টন নীতির কারণে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতাদের মতামতকে উপেক্ষা করা হতো এবং তাদের দাবিগুলো গুরুত্ব পেত না। গণপরিষদে এই বৈষম্য পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের রাজনৈতিক বঞ্চনার অনুভূতিকে আরও গভীর করে। এর ফলে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ নিজেদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে ভাবতে শুরু করে।

৭. মন্ত্রিসভায় বৈষম্য : পাকিস্তানের মন্ত্রিসভায় মোট সাতজন সদস্য থাকলেও বাঙালি ছিলেন মাত্র দুইজন। ক্ষমতার ভারসাম্যে এই বৈষম্য পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক বঞ্চনার অনুভূতিকে আরও তীব্র করে তোলে। এই সীমিত সংখ্যক বাঙালি মন্ত্রী তাদের প্রদেশের স্বার্থ যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারতেন না এবং তাদের ভূমিকা ছিল খুবই সীমিত। এই বৈষম্য প্রমাণ করে যে কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব পাকিস্তানকে রাজনৈতিকভাবে কতটা অবহেলা করত, যা শেষ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবোধ মনোভাবের জন্ম দেয়।

৮. প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের অভাব : প্রদেশগুলোকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়নি। কেন্দ্রীয় সরকার ইচ্ছামতো প্রাদেশিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারত। পাকিস্তানের প্রশাসনিক নীতি ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুসারে গঠিত হলেও বাস্তবে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণই প্রাধান্য পায়। এই নীতি পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যকে বাধাগ্রস্ত করে। কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ তাদের নিজস্ব চাহিদা অনুযায়ী প্রশাসনিক বা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারত না। এর ফলে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি আরও জোরালো হয়, যা ছয় দফা আন্দোলনের অন্যতম মূল ভিত্তি ছিল।

৯. ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা : পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পর থেকেই দেশকে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা ছিল স্পষ্ট। সংবিধান রচনার প্রাথমিক খসড়াতেই ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে প্রাধান্য দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।

১০. পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্য : পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক অধিকার বারবার উপেক্ষিত হয়। ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক নীতি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে, যা পরবর্তীতে স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করে।

উপসংহার : পরিশেষে বলতে পারি যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো শুরু থেকেই গভীর বৈষম্য, কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা, সামরিক আধিপত্য এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার দ্বারা প্রভাবিত ছিল। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, পশ্চিম পাকিস্তানের প্রাধান্য এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বঞ্চনামূলক নীতি দেশটির স্থিতিশীলতা নষ্ট করে দেয়। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর এই অসামঞ্জস্যই পরবর্তীতে পাকিস্তানে রাষ্ট্রকে দীর্ঘদিন সামরিক শাসন, রাজনৈতিক সংকট ও অবশেষে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দিকে ঠেলে দেয়।



অনার্স ১ম বর্ষ বাংলাদেশের ইতিহাস ভাষা সংস্কৃতি ও পরিচয় অধ্যায়-৬ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং গণ-অভ্যুত্থান ২০২৪ পর্যন্ত গাইড PDF

📥 PDF ডাউনলোড করুন

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!
Join