(অনার্স ১ম বর্ষ ব্যবস্থাপনা, মার্কেটিং, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগ ) ব্যষ্টিক অর্থনীতি Micro Economics অধ্যায়-১ অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ধারণাসমূহ পিডিএফ গাইড The Central Concepts of Economics Guide PDF

অনার্স ১ম বর্ষের শিক্ষার্থীরা তোমরা যারা ব্যবস্থাপনা (Management), মার্কেটিং (Marketing), ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং (Finance & Banking) বিভাগে পড়াশোনা করছো, তাদের সবার জন্যই ব্যষ্টিক অর্থনীতি (Microeconomics) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আবশ্যিক বিষয়।
এই অধ্যায়টি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
অর্থনীতি আসলে কী নিয়ে আলোচনা করে? আমাদের সম্পদ সীমিত কিন্তু অভাব অসীম—এই চিরন্তন সত্যের ওপর ভিত্তি করেই অর্থনীতির জন্ম। একটি দেশের বা সমাজের মূল অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো কী কী এবং সেগুলো কীভাবে সমাধান করা যায়, তার সবকিছুই এই "কেন্দ্রীয় ধারণাসমূহ" অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে। পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে প্রতি প্রশ্ন এসে থাকে। আমাদের এই অনার্স ১ম বর্ষ ব্যষ্টিক অর্থনীতি অধ্যায়-১ (অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ধারণাসমূহ) – সম্পূর্ণ পিডিএফ গাইড এর প্রশ্ন ও উত্তর দেওয়া হলো আর তার নিচে অধ্যায় ১ এর পিডিএফ ও দেওয়া হলো
প্রশ্ন। ১.০১ ।। অর্থনীতি কাকে বলে? অথবা, মার্শাল ও রবিল অর্থনীতিকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন? [জা.বি. ২০১৪, ২০১৭, ২০১৯ (হিসাববিজ্ঞান); ২০১৪, ২০২১ (ব্যবস্থাপনা); ২০১৬, ২০১৮, ২০২২ (ফিন্যান্স)] অথবা, অর্থনীতির সংজ্ঞা দাও।
উত্তর: ভূমিকা: সমাজ ও সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি চিন্তা-চেতনা এবং ধ্যান-ধারণার পরিবর্তন ঘটেছে। ফলে মানুষের কল্যাণের নিমিত্তে উৎপত্তি হয়েছে অর্থনীতি। অর্থনীতির ইংরেজি প্রতিশব্দ 'Economics' প্রাচীন গ্রিক শব্দ 'Oikonomia' হতে উদ্ভূত হয়েছে। যার অর্থ গৃহ ব্যবস্থাপনা। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে অর্থনীতি শব্দটির অর্থ গৃহ ব্যবস্থাপনার পরিধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাই অর্থনীতির বিষয়বস্তু ব্যাপক হওয়ায় এর সংজ্ঞার পরিধিও বিস্তৃত হয়েছে।
অর্থনীতির সংজ্ঞা: জীবনের মৌলিক অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়ে যে ধরনের প্রশ্ন লক্ষ করা যায় এবং সে সকল প্রশ্নের সমাধান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর যে বিষয়ে আলোচনা করা হয় তাকে অর্থনীতি বলে। নিম্নে কয়েকজন অর্থনীতিবিদদের জনপ্রিয় সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো-
তার মতে,
অর্থনীতির জনক এডাম স্মিথ এর মতে, "অর্থনীতি হচ্ছে সম্পদের বিজ্ঞান।" তার মতে, "অর্থনীতি এমন একটি বিজ্ঞান যা মানুষের সম্পদের প্রকৃতি ও কারণ সম্পর্কে আলোচনা করে।"
অধ্যাপক মার্শাল এর মতে, "অর্থনীতি হলো এমন একটি বিষয় যা মানব কল্যাণের সাথে সম্পর্কিত দৈনন্দিন জীবনের কার্যাবলি নিয়ে আলোচনা করে।"
অধ্যাপক এল, রবিন্স বলেন, "অর্থনীতি এমন একটি বিজ্ঞান যা মানুষের অভাব এবং বিকল্প ব্যবহারযোগ্য সীমিত সম্পদের মধ্যে সম্পর্ক বিষয়ক মানব আচরণ সম্পর্কে আলোচনা করে।"
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, যে শাস্ত্র মানুষের অসীম অভাব এবং বিকল্প ব্যবহারযোগ্য সীমিত সম্পদের মধ্যে সমন্বয়সাধনকারী কার্যাবলি নিয়ে আলোচনা করে তাঁকে অর্থনীতি বলে।
প্রশ্ন। ১.০২ ।। অর্থনীতি পাঠের প্রয়োজনীয়তা আলোচনা কর। [জা.বি. ২০১৬, ২০২০ (হিসাববিজ্ঞান)] অথবা, অর্থনীতি পাঠের গুরুত্ব তুলে ধর,
উত্তর: ভূমিকা: বর্তমানে অর্থনীতি পাঠের গুরুত্ব অপরিসীম। এমন একটা সময় ছিল যখন অর্থনীতির পাঠকে মানুষের জীবনে অপ্রয়োজনীয় বলে চিন্তা করা হত এবং অর্থনীতিকে 'সমাজ শাস্ত্র' বলে বিদ্রূপ করা হতো। কিন্তু বর্তমান কালে সেই ভুল ধারণার অবসান ঘটেছে। কারণ বর্তমান মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অর্থনীতির পাঠ জরুরি হয়ে পড়েছে।
অর্থনীতি পাঠের প্রয়োজনীয়তা: নিম্নে অর্থনীতি পাঠের প্রয়োজনীয়তা আলোচনা করা হলো:
১. বুদ্ধিমত্তার প্রসার ঘটে: অর্থনীতি পাঠের ফলে মানুষের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি পায় বলে এটি মানুষকে যুক্তিবাদী ও বস্তুনিষ্ঠ করে তোলে। এর ফলে মানুষের চিন্তা-চেতনা ও বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটে। এ বিষয়ে অধ্যাপক রবার্টসন বলেছেন, "অর্থনীতি পাঠের ফলে বিচার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।"
২. পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে: বর্তমান বিশ্বের উন্নত, অনুন্নত ও উন্নয়নশীল প্রায় সকল দেশেই দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের
জন্য অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা রচনা ও রূপায়ণের জন্য অর্থশাস্ত্রের জ্ঞান আবশ্যক। আবার জাতীয় জীবনে সীমিত সম্পদের মাধ্যমে কি উৎপাদন করা হবে, কার জন্য উৎপাদন করা হবে এর জন্যও পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। যা অর্থনীতি পাঠের মাধ্যমে সমাধান করা যায়।
৩. ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে: ব্যবসায়ীদের নিকট অর্থ শাস্ত্রের গুরুত্ব অপরিসীম। বাজারে কোন দ্রব্যের চাহিদা কি পরিমাণ, ভবিষ্যতে এদের চাহিদা কি হবে এবং চাহিদার পরিবর্তন হবে কিনা এসব জ্ঞান না থাকলে ব্যবসায়-বাণিজ্য দক্ষতার সাথে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। অর্থনীতি পাঠের মাধ্যমে এসব জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব।
৪. মিতব্যয়িতার ক্ষেত্রে: অর্থনীতি মানুষকে মিতব্যয়ী হতে শিক্ষা দেয় কিন্তু কৃপণ হতে নিষেধ করে। মানুষের অভাব অসীম কিন্তু আয় সে তুলনায় খুবই সীমিত। তাই মানুষকে সীমিত আয় দ্বারা অসীম অভাব পূরণ করার ক্ষেত্রে মিতব্যয়ী হতে হয়।
৫. সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার: সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের ক্ষেত্রে অর্থনীতি পাঠের বিকল্প নেই। কারণ সীমিত সম্পদ কিভাবে নিয়োগ করলে সর্বাধিক উৎপাদন হবে এবং জনগণের অর্থনৈতিক কল্যাণ সাধিত হবে তা একমাত্র অর্থনীতি পাঠের মাধ্যমে জানা যায়।
৬. অনুন্নত দেশের ক্ষেত্রে: অনুন্নত দেশসমূহের ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য, খাদ্য ঘাটতি, বেকারত্ব ইত্যাদি থেকে মুক্তি পেতে হলে অর্থনীতি পাঠ আবশ্যক। আবার নিরক্ষরতা দূরীকরণ এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য অর্থনীতি পাঠের প্রয়োজন।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, আধুনিক যুগে মানুষের সুখ ও সমৃদ্ধি অর্জনের প্রধান উপায় হলো অর্থ। অর্থনীতি ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতির সমৃদ্ধি বৃদ্ধির শিক্ষা দেয়। কাজেই সমাজের সর্বস্তরে অর্থনীতি পাঠের গুরুত্ব সর্বজনস্বীকৃত।
প্রশ্ন। ১.০৩ ।। অর্থনীতিতে যুগল থিমগুলো কী? সংক্ষেপে ব্যাখ্যা কর। [জা.বি. ২০২১ (ফিন্যান্স)]
উত্তর: অর্থনীতি এমন একটি বিষয় যেখানে সমাজ সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী উৎপাদন করবে এবং সেগুলো সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে বণ্টন করা হবে তা নিয়ে আলোচনা করা হয়। উক্ত সংজ্ঞার পেছনে অর্থনীতির দু'টি মৌলিক ধারণা কাজ করে। যথা- ১. সম্পদের স্বল্পতা এবং ২, সমাজ অবশ্যই তার সীমিত সম্পদ দক্ষভাবে ব্যবহার করবে।
যেহেতু সম্পদ সীমিত, তাই সীমিত সম্পদের দক্ষতাপূর্ণ ব্যবহারের উপর অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সমাজের কল্যাণ নির্ভর করছে। "দক্ষতা" দ্বারা বুঝায় সাধারণ জনগণের অসীম অভাব ও প্রয়োজন মেটানোর জন্য সীমিত সম্পদকে কতটা সর্বোত্তম দক্ষভাবে ব্যবহার করা যায়। সুতরাং সম্পদের স্বল্পতা এবং সেই সীমিত সম্পদের দক্ষতাপূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে অর্থনীতির আলোচনার মূল বিষয়বস্তু। এ কারণে স্বল্পতা এবং দক্ষতা অর্জন এই ধারণাকে আধুনিক অর্থনীতিতে দ্বৈত ধারণা বলা হয়।
স্বল্পতা বা দুষ্প্রাপ্যতা: দৈনন্দিন জীবনে মানুষকে সীমাহীন অভাবের সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু অভাব পূরণের জন্য যে পরিমাণ সম্পদ প্রয়োজন, সে পরিমাণ সম্পদ প্রকৃতিতে সরবরাহ নেই। এ প্রয়োজনীয় সম্পদের যে অভাব, তাকেই অর্থনীতিতে 'দুষ্প্রাপ্যতা' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। দুষ্প্রাপ্যতা বা স্বল্পতার সমস্যা অর্থনৈতিক ইতিহাসে প্রথম থেকেই স্বীকৃতি পেয়েছে। অর্থনীতিবিদ স্টেনিয়ার এবং হেগ-এর মতে, "অর্থনীতি মূলত স্বল্পতা এবং স্বল্পতার কারণে উদ্ভূত সমস্যা সংক্রান্ত বিজ্ঞানমান।" অধ্যাপক আর, জি, লিপসী বলেন, "দুষ্প্রাপ্যতার সমস্যা হচ্ছে মূল সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি সমস্যা যা অর্থনীতির অধিকাংশ বৈশিষ্ট্যের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।"
দক্ষতা: অর্থনীতিতে দক্ষতা বলতে অর্থনৈতিক দক্ষতাকে বুঝায়। অর্থনীতিতে নীতি মূল্যায়নের মানদণ্ড হিসেবে অর্থনৈতিক দক্ষতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সমাজে সম্পদ সীমিত। কিন্তু এই সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করে অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা হলো দক্ষতা বা অর্থনৈতিক দক্ষতা। বিভিন্ন অর্থনীতিবিদগণ বিভিন্নভাবে অর্থনৈতিক দক্ষতার বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। নিম্নে তা তুলে ধরা হলো- অর্থনীতির জনক এডাম স্মিথ বাজার ব্যবস্থায় অদৃশ্য হাতে সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক দক্ষতা অর্জনের কথা নির্দেশ করেছেন। জে. আর. ও এস, এম বলেন, "যে প্রক্রিয়ায় ভোক্তা তার প্রাপ্ত সম্পদের সাহায্যে সর্বোচ্চ তৃপ্তি লাভ করে, তাকে দক্ষতা বলে।" David C. Colander বলেন, "যখন সঞ্চয়ের একটি লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়, তাকে অর্থনৈতিক দক্ষতা বলে।" কল্যাণ অর্থনীতিতে সম্পদ ব্যবহারের দক্ষতাকে প্যারেটোর দক্ষতা অর্জনের কথা বলা হয়েছে। তাঁর মতে, সম্পদ পুনর্বণ্টন দ্বারা যদি একজনের ক্ষতি না করে অপরের কল্যাণ বৃদ্ধি সম্ভব না হয়, তবে বুঝা যাবে যে, সমাজে সম্পদ ব্যবহারে চূড়ান্ত বা পূর্ণ দক্ষতায় পৌঁছে গেছে। সম্পদ পুনর্বণ্টন করে যদি মোট কল্যাণ আর বাড়ানো না যায়, তখনই সম্পদ ব্যবহারের দক্ষতা অর্জিত হয়েছে বলে গণ্য হয়।
