![অধ্যায়-৪ বিভাজন-পরবর্তী যুগ (১৯৪৭-১৯৭১) [Post-Partition Era (1947-1971)] অধ্যায়-৪ বিভাজন-পরবর্তী যুগ (১৯৪৭-১৯৭১) [Post-Partition Era (1947-1971)]](https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEiKU7vsUBjR-rDTMG2d61JNxsmtCCo1oSUcYoBk76NwnCvcE99gP4zLX6U83VjrXQ2HMMcCHYMdSwo5LMXQ_RLHmIfmP0R1_m7RdcKQsHtwlwFZtcRV6ahcKJlU0YuY4CnX7dEg8tGN0GTYrFFJcqjFkr-jbOXN2fyW6eq8IRdmEU0w8FBJXklZ8DrC6Q/s16000-rw/ezgif.com-webp-maker%20(3).webp)
অধ্যায়-৪ বিভাজন-পরবর্তী যুগ (১৯৪৭-১৯৭১) [Post-Partition Era (1947-1971)]
❑ ভাষা আন্দোলন
প্রশ্ন ৷৷৪.০১৷৷ ভাষা আন্দোলন কী? ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পটভূমি ও ঘটনা প্রবাহের বিবরণ দাও। অথবা, ভাষা আন্দোলন বলতে কী বুঝ? ভাষা আন্দোলনের পটভূমি এবং ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে আলোচনা কর। অথবা, ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে ধারণা দাও। ভাষা আন্দোলন সংঘটিত হওয়ার কারণ সম্পর্কে আলোচনা কর। অথবা, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন কী? ভাষা আন্দোলনের বিবরণ দাও।
উত্তর : ভূমিকা : বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশের মূলে ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ধর্মভিত্তিক পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে ভাষভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রকাশ ঘটে। পূর্ব বাংলার জনগণের স্বাধিকার আন্দোলনের প্রথম বলিষ্ঠ পদক্ষেপই ছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। ৫২-এর এ ভাষা আন্দোলন সারা বিশ্বের ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত।
❑ ভাষা আন্দোলন : পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। ফলে বাঙালি জনগণ বিশেষ করে ছাত্র ও যুবসম্প্রদায় বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি রক্ষার জন্য ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে, এটাই 'ভাষা আন্দোলন' নামে খ্যাত।
❑ ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত : ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয় ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ঘোষিত প্রতিবাদ দিবসে এ আন্দোলন তীব্রতর হয়ে ওঠে এবং রক্তঝরার মাধ্যমে এ আন্দোলন বৈপ্লবিক আকার ধারণ করে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি। সাবেক পাকিস্তান গণপরিষদের বাংলা ভাষা বিরোধী সিদ্ধান্ত ও সরকারি দলের বাংলা ভাষা বিরোধী কার্যকলাপের ফলে ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়।
❑ ভাষা আন্দোলনের পটভূমি : ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক জনসভায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন, “উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।” তার এ ঘোষণাই ভাষা আন্দোলনের ধূম্রজাল সৃষ্টি হয় এবং চারদিকে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ১৯৫০ সালের মূলনীতি কমিটির রিপোর্টে পূর্ব পাকিস্তানি জনগণের প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের দাবি না থাকায় বাঙালি এ জনমত-এর প্রতি বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং তা প্রত্যাখ্যান করে। ১৯৫২ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দীন আবারও ঘোষণা করেন যে, “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।” এর প্রতিবাদে ছাত্র জনতা সমগ্র দেশব্যাপী ধর্মঘট আহ্বান করে এবং ধর্মঘটের প্রতি বিপুল জনসমর্থন পাওয়া যায়। এ অবস্থায় ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ পরিগ্রহ করলে তখনকার সরকার ভাষা আন্দোলনকে বানচাল করার জন্য এদেশের ছাত্রসমাজকে অস্ত্র ও গোলাবারুদের ভয় দেখায়। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি সমগ্র ঢাকা নগরীতে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। কিন্তু বাংলার নির্ভীক ও দামাল ছাত্রসমাজ ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে পড়ে। পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুসারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন কলাভবন থেকে মিছিল বের হয়। কিন্তু কিছু দূর অগ্রসর হতে না হতেই মিছিলের ওপর পাক পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণ শুরু হয়। ফলে ঘটনাস্থলেই শহিদ হন বরকত, সালাম, জব্বার ও রফিকসহ আরও নাম না জানা অনেকে। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর এ বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সারা বাংলায় বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে এবং তারা এক প্রবল ও অপ্রতিরোধ্য আন্দোলন গড়ে তোলে। এর ফলে শুরু হয় মাতৃভাষার অধিকার আদায় ও বাঙালি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। এ আন্দোলনের তীব্রতায় পাকিস্তান সরকার বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা বলে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। এভাবে রক্তের বিনিময়ে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করে।
❑ ভাষা আন্দোলনের পটভূমি এবং ঘটনা প্রবাহ : ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন একদিনে সৃষ্টি হয়নি। বাঙালি জাতির ওপর অর্থাৎ তৎকালীন সময়কার পশ্চিম পাকিস্তানিরা পূর্ব পাকিস্তানিদের ওপর অনেক অত্যাচার, করেছে, শোষণ নিপীড়ন সবকিছু মুখ বুজে মেনে নিলেও নিজের মাতৃভাষা বাংলাকে যখন পশ্চিম পাকিস্তানিরা কেড়ে নিতে চেয়েছিল তখন তারা আর চুপ করে থাকতে পারেনি। তাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদের চেতনার উদয় ঘটে। ভাষা আন্দোলন সৃষ্টির পেছনে ব্যাপক ঘটনা বহুল বিষয় রয়েছে। আর এ বিষয়গুলো এবং ভাষা আন্দোলন সংঘটনের পটভূমি সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো :
১. পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষাকে সমর্থন দান : পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু হবে এ বিষয়ে তৎকালীন সময়কার বুদ্ধিজীবী এবং শিক্ষিত মহলে একটা আলোচনার সৃষ্টি হয়। ১৯৪৭ সালে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মনোনীত করলেও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষার পক্ষে তাঁর মতামত প্রকাশ করেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছাড়াও তৎকালীন সময়ের অন্যান্য লেখকগণও বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বেছে নেন। আর এ কারণে পূর্ব বাংলার শিক্ষিত সমাজ এবং ছাত্রসমাজের মধ্যে একটি ভিন্ন ধরনের চেতনার উদয় ঘটে।
এসময অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের পর এ ঘটনাগুলো যেমন শিক্ষিত সমাজের নজর কাড়ে, তেমনি দেশের পত্র-পত্রিকা এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গন বাংলাভাষা পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সমর্থন দেয়।
২. পূর্ব পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক যুবলীগের সমর্থন : পূর্ব পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগ নামক সংগঠনটি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিকে সাদরে গ্রহণ করে। ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর এক সম্মেলনে এ সংগঠনটি বাংলা ভাষার সপক্ষে যে সিদ্ধান্তগুলো দিয়েছিল তা ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। এ সংগঠনটি পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থা, আইনকানুন ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে বাংলা ভাষাকে ব্যবহার করার দাবি জানায়। এছাড়াও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বেছে নেওয়ার দায়িত্ব এবং অধিকার জনগণকে ন্যস্ত করার ব্যাপারেও উক্ত সম্মেলনে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এছাড়াও তমুদ্দুন মজলিস নামক একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনও বাংলা ভাষা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সমর্থন দেয়।
৩. বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি অগ্রাহ্যকরণ : তৎকালীন সময়ে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাষা ছিল বাংলা, আর মাত্র ৩.২৭% অর্থাৎ সংখ্যালঘু মানুষ উর্দু ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছিল। তা সত্ত্বেও আইন ব্যবস্থা, শিক্ষা ক্ষেত্রে, অফিস-আদালত ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে এ ভাষা অর্থাৎ উর্দু ভাষাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হতো। এমনকি পাকিস্তানের পাবলিক সার্ভিস, নৌ-বিভাগ এবং অন্যান্য বিভাগের নিয়োগ পরীক্ষা থেকে বাংলা ভাষাকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এসময ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের সকল রাজনৈতিক কাজ তথা বিভিন্ন বিভাগের; যেমন- আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে উর্দু এবং ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি সরকারি ভাষার মর্যাদা প্রদানের প্রস্তাব উত্থাপন করে। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবনার ওপর একটি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এ আলোচনা চলাকালীন সময়ে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে যুক্তি দেন। কিন্তু তিনি অমুসলিম বলে মুসলিম নেতৃবৃন্দ তাঁর এ প্রস্তাবের মাঝে প্রাদেশিকতার ছায়া দেখতে পায়। আর তাই তার প্রস্তাবকে বাতিল ঘোষণা করা হয়। এ সময় গণপরিষদের অধিবেশনে লিয়াকত আলী খান বলেন যেহেতু পাকিস্তান একটি মুসলমান দেশ তাই এ রাষ্ট্রের সাধারণ ভাষা হবে উর্দু এবং উর্দু সরকারি ভাষা হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হবে। এভাবেই বাংলাকে গণপরিষদের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিকে অগ্রাহ্য করা হয়েছিল। ফলে পূর্ব বাংলায় এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য গণ আন্দোলন সৃষ্টি হয়।
৪. উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার প্রতিবাদ : লিয়াকত আলী খান উর্দুকে সর্বপ্রথম পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করার পর ১৯৪৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্ররা ধর্মঘট পালন করে। তারা রমনা এলাকায় ধর্মঘট চালায় এবং স্লোগান দিতে দিতে মিছিল করে। এ মিছিল এবং ধর্মঘট শেষ হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সভায় তারা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবনার পক্ষে যুক্তি দেয়। তৎকালীন সময় পাকিস্তানের মুদ্রায়, টিকিটে, মানি অর্ডার ফরমে শুধু উর্দু ভাষা উল্লেখ করা হতো। কিন্তু বাংলা ভাষার কোনো উল্লেখ ছিল দলীয় ছিল না। আর এর প্রতিবাদেও ঐ দিন ছাত্ররা মুখর হয়ে ওঠে।
৫. রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ : বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন আরও জোরদার করার উদ্দেশ্যে ১৯৪০ সালের ১ অক্টোবর 'রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ' নামক একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার দাবিতে সমস্ত পূর্ব পাকিস্তানে ধর্মঘট আহ্বান করে এই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। এ সময় ছাত্র ধর্মঘট চলাকালীন সময়ে পুলিশ ছাত্রদের ওপর লাঠিচার্জ করে এবং ৫০ জন ছাত্র মারাত্মকভাবে আহত হয়। উক্ত সমাবেশে ছাত্ররা খাজা নাজিমউদ্দিন এবং তার মন্ত্রিসভার বিরোধিতা করে। এ আন্দোলনের পর সরকার ঘোষণা করে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষায় পরিণত করার আন্দোলন মূলত রাষ্ট্র বিরোধী এক গভীর ষড়যন্ত্র এবং চক্রান্ত। কিন্তু তারপরও এ ছাত্র আন্দোলন থেমে যায়নি, বরং আরও শক্তিশালী হয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। আর পরিস্থিতি এমন পর্যায় পৌঁছে যায় যে, নাজিমউদ্দিন ছাত্রদের কাছে হার মানে এবং ১৫ মার্চ তাদের সাথে এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়। এ আলোচনা সভায় আট দফা কর্মসূচি গ্রহণসহ নাজিমউদ্দিন রাষ্ট্রভাষার পক্ষে এ আন্দোলনকে সমর্থন জানান।
৬. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর পূর্ব বাংলায় আগমন : নাজিমউদ্দিনের আট দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য তাঁর নেওয়া পদক্ষেপসমূহ সম্পর্কে জানতে ১৯৪৮ সালের ১৭ মার্চ ছাত্ররা এক সমাবেশের আয়োজন করলে উক্ত সমাবেশে পুলিশ গুলি করে। ফলে সমাবেশ সুষ্ঠুভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। এমন এক সংকটময় পরিস্থিতিতে নাজিমউদ্দিনের আহ্বানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব বাংলায় আসেন এবং ঘোষণা করেন, 'উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা'। জিন্নাহ এরপর আন্দোলনকারীদের 'পঞ্চমবাহিনী' নামে অভিহিত করেন। তার এ ঘোষণা এবং স্বৈরাচারী মনোভাব পূর্ব বাংলার বুদ্ধিজীবী এবং শিক্ষিত মহল তথা আপামর জনসাধারণের মনে কিছুটা অসন্তুষ্টির সৃষ্টি হয়।
৭. জিন্নাহর আগমনের পর ভাষা আন্দোলন : জিন্নাহ পূর্ব বাংলা সফর করার পর ভাষা আন্দোলন থেকে অনেক নেতাকর্মী সরে আসে। কারণ জনগণের কাছ থেকে অগাধ বিশ্বাস অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। আর তাই ভাষা আন্দোলনকে তিনি পাকিস্তানের শত্রুদের বিদ্বেষের ফলাফল হিসেবে আপামর জনসাধারণের নিকট উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তমুদ্দুন মজলিস তার কথা অনুসারে ভাষা আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ সময় ভাষা আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হলেও থেমে যায়নি। ১৯৪৯ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান বাংলা ভাষাকে আরবি ভাষায় রূপান্তরিত করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। কিন্তু এ প্রস্তাবের প্রতিবাদ করে বাংলা বিভাগের ছাত্রছাত্রীবৃন্দ এবং ৯ মার্চ মাওলানা আকরাম খাঁ পূর্ব বাংলা ভাষা কমিটি গঠন করে। এরই মধ্যে ১৯৪৯ সালের ৩১ মার্চ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এ প্রস্তাবের তীব্র নিন্দা করলে সরকারের টনক নড়ে এবং তখনকার মতো বাংলা ভাষাকে আরবিকরণের প্রয়াস কিছুটা স্তিমিত হয়ে যায়।
১৯৫০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর পুনরায় উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব আসে কিন্তু ৪ ও ৫ নভেম্বর রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ও উর্দু উভয় ভাষাকে সমর্থন জানায় পূর্ব পাকিস্তানিরা। কিন্তু এ সময় এ বিষয়টি চাপা পড়ে যায়।
৮. পুনরায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন : ১৯৫০ সালে রাষ্ট্রভাষার দাবি ঢাকা পড়ে যায়। যার ফলে কিছু সংগ্রামী ছাত্ররা পুনরায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে যেটির আহ্বায়ক হিসেবে আবদুল মতিনকে নিযুক্ত করা হয়।
৯. ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের তীব্রতা : ১৯৫২ সালে জানুয়ারির শেষের দিকে খাজা নাজিমউদ্দিনের একপাক্ষিক ভাষণ ভাষা আন্দোলনকে আরও জোরদার করে। তিনি পুনরায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ অনুরূপ ভাষণ দেন। তাঁর এ ঘোষণায় ছাত্র-শিক্ষক এবং বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ফলে এরই প্রতিবাদে ৩০ জানুয়ারিতে 'রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ' ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ধর্মঘটের আয়োজন করে। এ সভায় ৪ জানুয়ারি তারিখে ছাত্র ধর্মঘট, বিক্ষোভ মিছিল এবং ছাত্র সভা করার ঘোষণা দেয় 'রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ'। ভাষা আন্দোলনকে বিস্তৃত করার উদ্দেশ্যে ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারিতে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে এক সভায় 'সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ' গঠিত হয়। উক্ত সভায় তিনি ৪ ফেব্রুয়ারির ধর্মঘট, মিছিল, সভাকে সমর্থন জানায় এবং একুশে ফেব্রুয়ারিতে হরতাল, মিছিল এবং সভা করার জন্য আহ্বান জানিয়েছিল।
১০. পূর্ব পাকিস্তানে ১৪৪ ধারা জারীকরণ : ৪ ফেব্রুয়ারি সভা, ধর্মঘট, মিছিল সংঘটিত হওয়ার পর ১২ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনকে সমর্থনকারী ইংরেজি পত্রিকা 'দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার'-এর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং ২০ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। কিন্তু ছাত্ররা বিক্ষুব্ধ হয়ে ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছাত্ররা ১৪৪ ধারা না ভাঙার পক্ষে তাদের অভিমত ব্যক্ত করেন।
১১. ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত গ্রহণ : ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত পর্যন্ত ১৪৪ ধারা ভাঙার এবং না ভাঙার বিষয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত অন্যান্য ছাত্ররা, নেতাকর্মীয়া ও যুবলীগ কর্মীগণ ১৪৪ ধারা ভাঙার লক্ষ্যে পৃথক পৃথকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
১২. একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখের চূড়ান্ত আন্দোলন : ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখে বাংলার মানুষ তাদের ইতিহাসের সাথে এক নতুন অধ্যায়ের সংযোজন ঘটায়। এ দিন সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্ররা বিভিন্ন সংগঠন থেকে দুজন দুজন করে সমবেত হয়। ঐ দিন বেলা ১১ টার দিকে ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সভায় ১৪৪ ধারা ভাঙতে ছাত্ররা উদ্যত হয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ আন্দোলনে মুসলিম লীগও ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভাঙার উদ্দেশ্যে পথে নামলে পুলিশ অনেক ছাত্রকে গ্রেফতার করে। কিন্তু তারপরেও ছাত্র মিছিল বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছিল না। তখন পুলিশ ছাত্র মিছিলের ওপর লাঠি চার্জ করে এবং টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। অবস্থায় ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং মেডিক্যাল কলেজের প্রাচীর টপকে মেডিকেল হোস্টেলের প্রধান ফটকে এসে সমবেত হয়।
১৩. একুশে ফেব্রুয়ারি কর্মসূচি : মেডিক্যাল কলেজের প্রধান ফটক থেকে ছাত্ররা আবার মিছিল বের করার উদ্যোগ নেয়। তখন তিনজন তিনজন করে ছাত্র মিছিল বের করে। কিন্তু তারপরেও পুলিশ মিছিলের ওপর টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। ফলে ছাত্ররা মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেলের সামনে এসে আশ্রয় নেয়। কিন্তু সেখানেও পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং ছাত্রদের ওপর লাঠিচার্জ করে। এর প্রতিবাদে ছাত্ররা ইট-পাটকেল ছুঁড়তে থাকে। ফলে এমন পরিস্থিতিতে ঘটনাস্থলেই আবদুল জব্বার এবং রফিকউদ্দীন আহমেদ নিহত হন। ১৭ জন আহত হন যাদেরকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের মধ্যে আবুল বরকত রাত আটটার সময় শহিদ হন। এরপর ছাত্রছাত্রীদের ওপর অতর্কিতভাবে গুলি চালানো হয় যাতে এক ভয়ানক পরিস্থিতির জন্ম হয়।
১৪. ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ভাষা শহিদ : ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতেই যে শুধু সকল শহিদ মৃত্যুবরণ করে তা নয়। ২২ ফেব্রুয়ারিতেও অনেকে মৃত্যুবরণ করেন। আবার আহতদের মধ্যে অনেকেই এ ঘটনার কিছুদিন পর মৃত্যুবরণ করেন। ভাষা শহিদ সালাম ৭ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন। ভাষা শহিদদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য শহিদরা হলেন আবদুল জব্বার, রফিকউদ্দিন আহমদ, আবদুস সালাম, আবুল বরকত, শফিউর এবং আরও অনেকে। তাঁদের মধ্যে প্রথম ভাষা শহিদ রফিকউদ্দিন আহমেদ।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি সমগ্র বাঙালি জাতি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। আর এ জাতি মায়ের ভাষাকে কলুষিত হতে দেয়নি। জীবন দিয়ে এ ভাষার সম্মান অক্ষুণ্ণ রেখেছে। আর তাই আজ আমরা বাংলা ভাষায় স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারি। বাংলাদেশ আজ আমাদের মাতৃভূমি এবং আমরা বাঙালি জাতি হিসেবে বিশ্বের সর্বত্র পরিচয় দিতে পারি। আর এ সবকিছু সম্ভব হয়েছে ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগের ফলে। কারণ ভাষার জন্য লড়াই করে তারা বাঙালি জাতিকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করেছে।
প্রশ্ন ৷৷৪.০২৷৷ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব বর্ণনা কর। অথবা, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য আলোচনা কর। অথবা, ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব/তাৎপর্য ব্যাখ্যা কর। অথবা, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব/ভূমিকা/অবদান ব্যাখ্যা কর।
উত্তর : ভূমিকা : ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি টিকে আছে। এ আন্দোলনের মাধ্যমে আমাদের বাঙালি জাতিসত্তা বিদ্যমান রয়েছে। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতিকে সমূলে ধ্বংস করার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। তাই ১৯৪৭ সালে শুরু হওয়া ভাষা আন্দোলন ১৯৫২ সালে চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে।
❑ ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য : নিচে ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বর্ণনা করা হলো :
১. বাঙালি জাতীয়তাবোধ সৃষ্টি : মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম হচ্ছে ভাষা। পূর্ব পাকিস্তানের সেই মাতৃভাষার ওপর আঘাত হানে পশ্চিম পাকিস্তানিরা। ভাষার ওপর আঘাতের প্রতিক্রিয়ায় পূর্ব বাংলায় আন্দোলনের জোয়ার ওঠে। এ আন্দোলন পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি জাতীয়তাবোধের সৃষ্টি করে। সকলে মিলে এ জাতিসত্তার মধ্যে পরিচিত হয়ে ওঠে।
২. বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা : পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী চেয়েছিল উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রচলন করতে। এতে পূর্ব বাংলার সকল অফিস, আদালত, শিক্ষা পদ্ধতি উর্দুতে চালু হতো। তাহলে বাংলা ভাষা একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। বাঙালিদের প্রবল আন্দোলনের মুখে এ হীন চক্রান্ত ব্যর্থ হয়। বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করে। ১৯৫৬ সালের সংবিধানে পাকিস্তান সরকার বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেয়।
৩. রাজনৈতিক বিবর্তন : বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তনে ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম। বাঙালিরা স্বাধিকারের ব্যাপারে সচেতন ছিল না। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাঙালিদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা জাগ্রত হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তনে ভাষা আন্দোলন ছিল প্রথম পদক্ষেপ।
৪. যুক্তফ্রন্টের জয়লাভ : ভাষা আন্দোলন দমন করার নামে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের ওপর যে অত্যাচার চালায় তা রাজনৈতিক কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করে ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যুক্তফ্রন্ট মুসলিম লীগের ভরাডুবি ঘটিয়ে জয়লাভ করতে সক্ষম হয়। যুক্তফ্রন্টের জয়লাভ দ্বারা মুসলিম লীগের পতন ঘটে এবং পূর্ব বাংলার বাঙালিরা স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটায়।
৫. ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ : পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের শাসন ও শোষণ করার ষড়যন্ত্র করেছিল। ভাষাকে কেন্দ্র করে যে ষড়যন্ত্রের জাল তারা বুনেছিল তা প্রতিরোধ করতে সক্ষম হওয়ায় পরবর্তীকালে তাদের অন্যান্য ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা বাঙালিদের পক্ষে সম্ভব হয়।
৬. সাম্প্রদায়িকতার অবসান : দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান গঠিত হওয়ার পর পূর্ব বাংলায় সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালিদের মধ্য থেকে সাম্প্রদায়িকতা দূর করে সকল ধর্ম-বর্ণের মধ্যে একটা প্রীতির বন্ধন সৃষ্টি করে।
৭. শহিদ মিনার স্থাপন ও শহিদ দিবস পালন : ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে যারা শহিদ হন তাদের স্মরণে বাংলার শহর-বন্দর ও গ্রাম-গঞ্জে অসংখ্য শহিদ মিনার স্থাপন করা হয়। UNESCO ১৯৯৯ সালে, ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি যারা বাংলা ভাষার জন্য শহিদ হয়েছেন তাদের স্মরণে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে, যা একমাত্র ভাষা আন্দোলনেরই প্রতিফলন। এ দিনটিকে বাঙালি জাতি সম্মানের সাথে পালন করে এবং শহিদ মিনারে ফুল দিয়ে শহিদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে।
৮. জাতীয় চেতনার উন্মেষ : বাঙালি জাতি ভাষা আন্দোলনের পর বুঝতে পারে পশ্চিম পাকিস্তানিরা ধর্মের নামে পূর্ব বাংলায় শোষণ করছে। ৫২ এর ভাষা আন্দোলনের পর প্রতিটি নির্বাচনে পূর্ব বাংলার প্রার্থীগণের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জিত হয়েছে। পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে জাতীয় ঐক্যের প্রভাব পরিলক্ষিত হতে থাকে। তাই মানুষের মধ্যে জাতীয় চেতনা উন্মেষ হয়।
৯. দাবি আদায়ে শিক্ষা : ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের মতো এতো দুর্বার আন্দোলন এর আগে কখনো হয়নি। শান্তি পূর্ণভাবে কীভাবে দাবি আদায় করা যায় তা এ আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালিরা শিখে নেয়। এ আন্দোলনের সাফল্যের ফলে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা আন্দোলনে বাঙালিরা শ্রেণি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ফলে পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি দেশের অভ্যুদয় ঘটে।
১০. মধ্যবিত্ত বাঙালিদের রাজনীতিতে প্রবেশ : ১৯৫২ সালের পূর্বে ভারতবর্ষে উচ্চবিত্ত ও জমিদার শ্রেণি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতো। কিন্তু ভাষা আন্দোলনে মধ্যবিত্ত বাঙালিরা সক্রিয় অংশগ্রহণ করে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্যরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। এতে মধ্যবিত্তদের সাথে তাদের স্বার্থের দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করে। ভাষা আন্দোলনে তাই মধ্যবিত্তদের সক্রিয় অংশগ্রহণ লক্ষ করা যায়। এরপর থেকে পূর্ব বাংলায় মধ্যবিত্তদের রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি হয়।
১১. ছাত্রদের গুরুত্ব বৃদ্ধি : ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ছাত্ররা অসামান্য অবদান রাখে। পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা যায় সকল আন্দোলনেই ছাত্রদের অক্লান্ত চেষ্টায় সাফল্যমণ্ডিত হয়। ভাষা আন্দোলনের পর থেকেই ছাত্রনেতাদের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। এরপর গঠিত হয় ছাত্রলীগ। ছাত্র নেতারাই পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে বিজয় ছিনিয়ে আনে।
১২. সংগ্রামী মনোভাব সৃষ্টি : ভাষা আন্দোলনের সময় থেকেই বাংলার রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়। এরপর থেকেই এদেশের মানুষ প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। পাকিস্তানি শাসক চক্রের শোষণের সোচ্চার হয়ে ওঠে পূর্ব বাংলার কোটি জনতা। পরবর্তীতে এ সংগ্রামী মনোভাব বাংলাদেশকে স্বাধীনতা এনে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১৩. একুশের চেতনা : বাংলাদেশের মানুষ একুশে ফেব্রুয়ারির আত্মত্যাগ থেকে যে চেতনা লাভ করেছে তা জাতির সকল আন্দোলনে প্রেরণা হিসেবে কাজ করছে। সমগ্র জাতির একতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে একুশের চেতনাকে কেন্দ্র করে। ঐক্যবদ্ধ জাতি দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছে একুশের চেতনা থেকে। বাংলাদেশের জনগণের স্বজাত্যবোধের স্ফুরণের উৎস ২১। ২১ হচ্ছে দেশ ও জাতির নতুন ইতিহাসের জন্মদাতা।
১৪. বীর মুক্তিযোদ্ধা সৃষ্টি : ভাষা আন্দোলনকারীরাই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশকে এনে দিয়েছে স্বাধীনতার লাল সূর্য। এক্ষেত্রে ভাষা আন্দোলনকারীদের সাথে ছাত্র, যুবসমাজ, কৃষক-শ্রমিকসহ দেশের সর্বস্তরের জনসাধারণের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করে। এরাই পরবর্তীতে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মানিত হয়।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, পূর্ব বাংলার জাতীয় ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম। এ আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালির হৃদয় সংগ্রামী চেতনার বীজ বপন হয়। ক্রমে তা গজিয়ে শাখা-প্রশাখার সৃষ্টি হয়ে চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে।
