অর্নাস বাংলাদেশের ইতিহাস অধ্যায়-৩ উপনিবেশিক যুগ (২০শ শতক) গাইড পিডিএফ

Ahsan

বাংলাদেশের ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয় বাংলাদেশের ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়

অর্নাস বাংলাদেশের ইতিহাস অধ্যায়-৩ উপনিবেশিক যুগ (২০শ শতক) গাইড পিডিএফ

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (National University) অনার্স ১ম বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য আজকের বিশেষ আয়োজনে থাকছে— "বাংলাদেশের ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়" (History of Bangladesh: Language, Culture & Identity) বিষয়ের অধ্যায়-৩ উপনিবেশিক যুগ (২০শ শতকের প্রথমার্ধ) [Colonial Era (First Half of the 20th Century)] এর সম্পূর্ণ গাইড PDF নিয়ে এসেছি। পরীক্ষার সেরা প্রস্তুতির জন্য নিচে এই অধ্যায়-৩ উপনিবেশিক যুগ (২০শ শতকের প্রথমার্ধ) [Colonial Era (First Half of the 20th Century)] অধ্যায়ের গাইড পিডিএফ দেওয়া হলো। এছাড়া, যারা অনার্স ১ম বর্ষের বাংলাদেশের ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয় অধ্যায়-৩ গাইড PDF পড়তে বা ডাউনলোড করতে চান তাদের জন্য পোস্টের একদম শেষে অনার্স ১ম বর্ষের History of Bangladesh: Language, Culture & Identity Chapter 3 Guide পিডিএফ (PDF) ডাউনলোড লিংক দেওয়া আছে। চলুন আগে কিছু প্রশ্নোত্তর দেখে নেওয়া যাক!

প্রশ্ন ৷৷৩.০১৷৷ বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) কী? ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের কারণ ও ফলাফল আলোচনা কর। অথবা, বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) বলতে কী বুঝ? ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের কারণগুলো কী কী? কেন বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়েছিল। অথবা, বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) সম্পর্কে সংক্ষেপে লিখ। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ কেন হয়েছিল? এর ফলাফল বিশদভাবে আলোচনা কর।

উত্তর : ভূমিকা : ব্রিটিশ ভারত ও বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে বঙ্গভঙ্গ একটি অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ১৯০৫ সালে ভারতের তৎকালীন বড়লাট লর্ড জর্জ নাথানিয়াল কার্জন বাংলা প্রদেশ ভাগ করেন, যা ইতিহাসে বঙ্গভঙ্গ নামে পরিচিত। বঙ্গভঙ্গের ফলে 'পশ্চিমবঙ্গ' ও 'পূর্ববঙ্গ' নামে নতুন দুটি প্রদেশ গঠিত হয়। বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার সমন্বয়ে গঠিত পূর্ববঙ্গের সাথে মালদহ জেলার চিফ কমিশনার শাসিত আসামের সংযুক্ত করে পূর্ব বাংলা ও আসাম নামে একটি নতুন প্রদেশ গঠন করা হয়। যেটি ইতিহাসে 'বঙ্গ' নামে পরিচিতি লাভ করে। বঙ্গভঙ্গ ও এর পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাবলি ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। বঙ্গভঙ্গ ও রদকে কেন্দ্র করে বাংলার প্রধান দুটি ধর্মীয় সম্প্রদায় হিন্দু ও মুসলমানের দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা ঐক্যের বিপরীতে অনৈক্যের সূত্রপাত ঘটে।

❑ বঙ্গভঙ্গ : ১৮৯৮ সালে লর্ড কার্জন ভারতের বড়লাট হিসেবে কার্যভার গ্রহণ করেন। লর্ড কার্জনের শাসনকালের মধ্যে সর্বাপেক্ষা তাৎপর্যপূর্ণ সংস্কার হলো বঙ্গভঙ্গ। তৎকালে সমগ্র বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, মধ্য প্রদেশ ও আসামের কিছু অংশ নিয়ে ছিল বঙ্গ প্রদেশ বা বাংলা প্রেসিডেন্সি। প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালে এই বিরাট প্রদেশকে দুইভাগে ভাগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি উত্তর ও পূর্ব বাংলাকে আসামের সাথে সংযুক্ত করে একটি নতুন প্রদেশ সৃষ্টি করেন। এই নবগঠিত প্রদেশের নামকরণ করেন পূর্ব বাংলা ও আসাম। অপরদিকে পশ্চিম বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার সমন্বয়ে আরেকটি প্রদেশ গঠিত হয়। যার নাম দেওয়া হয় 'বাংলা প্রদেশ' (Bangla Presidency)। ১৯০৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর বঙ্গ বিভাগের ঘোষণা প্রচারিত হলেও ১৬ই অক্টোবর থেকে কার্যকর হয়েছিল।

❑ বঙ্গভঙ্গের কারণ : বঙ্গভঙ্গের কারণ বিশ্লেষক ঐতিহাসিকরা দুটি বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। ব্রিটিশ সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বঙ্গভঙ্গের প্রধান কারণ হিসেবে প্রশাসনিক কারণকে উল্লেখ করলেও এর পিছনে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণও বিদ্যমান। নিম্নে বঙ্গভঙ্গের কারণগুলো আলোচনা করা হলো :

১. প্রশাসনিক কারণ : ব্রিটিশ সরকারের বঙ্গভঙ্গের উদ্যোগ নেয়ার পিছনে প্রশাসনিক কারণ হলো : 

(ক) বাংলা প্রদেশের আয়তনের বিশালতা : ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ মনে করেন যে, বাংলা একটি বিশাল প্রদেশ। বিভক্তির আগে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, মধ্য প্রদেশ ও আসামের কিছু অংশ নিয়ে বাংলা প্রদেশ ছিল। এটি ছিল আয়তন ও জনসংখ্যার দিক দিয়ে সবচেয়ে বড় প্রদেশ। এর আয়তন ছিল ১ লক্ষ ৮৯ হাজার বর্গমাইল এবং জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৮০ লক্ষ। একজন গভর্নরের পক্ষে এত বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনা করা দুরূহ হয়ে পড়ে। এজন্য প্রশাসনিক সুবিধার কথা বিবেচনা করে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ করা হয়। 

(খ) বঙ্গ প্রদেশে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা : পূর্ব বাংলার যোগাযোগ, পুলিশ ও ডাকব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে দক্ষিণ ও পূর্ব বাংলার বিস্তীর্ণ চর ও হাওড়ে প্রতিনিয়ত চুরি, ডাকাতি ও বেআইনি কর্মকাণ্ড হতে থাকে। বাংলাকে এসব অরাজক পরিস্থিতি থেকে মুক্ত করে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

২. রাজনৈতিক কারণ : বেশিরভাগ ভারতীয় ঐতিহাসিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে বঙ্গভঙ্গের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বঙ্গভঙ্গের পিছনে যেসব রাজনৈতিক কারণ বিদ্যমান ছিল তা হলো : 

(ক) বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা ধ্বংস করা : কলকাতা কেন্দ্রিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের শক্ত ভিত গড়ে ওঠে। বিশেষ করে ১৮৮৫ সালে ভারতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর থেকে তা আরো সুদৃঢ় হতে থাকে। ব্রিটিশ সরকার মনে করে জাতীয়তাবাদী এ শক্তিকে নস্যাৎ করে দিতে পারলে বাঙালির শক্তি ক্ষীণ হয়ে যাবে। এই ভেবে সরকার বঙ্গভঙ্গের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। 

(খ) কংগ্রেসকে দুর্বল করা : ১৮৮৫ সালে ভারতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ভারতবাসীর মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের রাজনৈতিক সচেতনতা ব্রিটিশ সরকারকে শঙ্কিত করে তুলে এবং বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে কংগ্রেসকে দ্বিধাবিভক্ত করে এর শক্তি হ্রাস করে। 

(গ) বিভক্ত ও শাসননীতি : বঙ্গভঙ্গের অন্যতম কারণ ছিল ব্রিটিশ সরকারের 'বিভক্ত ও শাসননীতি'র (Divide and Rule Policy) অন্যতম একটি অংশ। ভারতে ব্রিটিশ রাজশক্তিকে শক্তিশালী করা ও বাঙালিদের শক্তি ক্ষীণ করার জন্য দুই বাংলাকে বিভক্ত করা নীতি অবলম্বন করা হয়।

৩. অর্থনৈতিক কারণ : বঙ্গভঙ্গের পিছনে ব্রিটিশ সরকারের অর্থনৈতিক কারণগুলো নিম্নরূপ : 

(ক) অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীভূত করা : অবিভক্ত বাংলায় বাংলার রাজধানী হিসেবে ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছু কলকাতা কেন্দ্রিক হওয়ায় বাংলা প্রদেশ অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে পড়ে। এজন্য বাংলায় অর্থনৈতিক বিকাশসাধন, ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রসার ও অবকাঠামোগত উন্নয়নসাধনের জন্য বঙ্গভঙ্গ করা হয়। 

(খ) জমিদারদের অত্যাচার থেকে রায়তদের মুক্তি : কলকাতা কেন্দ্রিক আধুনিক সভ্যতার বিকাশসাধনের ফলে বাংলার অধিকাংশ জমিদার কলকাতায় বসবাস করা শুরু করে। তাদের অনুপস্থিতিতে তাদের নিযুক্ত নায়েব, গোমস্তারা রায়ত তথা প্রজাদের উপর নানাভাবে অত্যাচার করতো। প্রজাদের এমন অত্যাচার থেকে মুক্ত করার জন্য ও তাদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আনয়নের জন্য বঙ্গভঙ্গ করা হয়।

৪. সামাজিক ও ধর্মীয় কারণ : ব্রিটিশ শাসনের শুরু থেকে তাদের বৈষম্যমূলক আচরণের ফলে মুসলমানরা ধীরে ধীরে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রাধান্য হারাতে থাকে। তাছাড়া স্মরণাতীতকাল থেকে পূর্ব বাংলায় মুসলমানদের ও পশ্চিম বাংলায় হিন্দুদের প্রাধান্য বিরাজমান ছিল। এজন্য ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের সামাজিক ও ধর্মীয় বিষয় বিবেচনা করে বঙ্গভঙ্গের জন্য উদ্যোগী হয়।

❑ বঙ্গভঙ্গের ফলাফল : ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ সরকারের গভর্নর লর্ড কার্জন কর্তৃক ঘোষিত বঙ্গভঙ্গ বাংলার জনগণের জন্য সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা ও সংস্কৃতিসহ প্রভৃতি ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনে দেয়। এজন্য বাংলার জনগণ বঙ্গভঙ্গকে সাদরে গ্রহণ করে। ১৯০৬ সালের ১৬ই অক্টোবর বঙ্গভঙ্গের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে ইস্টার্ন বেঙ্গল এন্ড আসামের 'ইরা' পত্রিকায় বঙ্গভঙ্গের ৮টি সুবিধার কথা উল্লেখ করে। সেগুলো নিম্নরূপ : 

১. ঢাকা নগরের পুনর্জন্ম ও চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নতি। 

২. নদী ও খালগুলোর উন্নতি, রেললাইনের সম্প্রসারণ, চট্টগ্রামের সাথে সংযোগ স্থাপন। 

৩. নতুন প্রাদেশিক পরিষদ গঠিত হওয়ার ফলে জমিদার ও সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধিদের পক্ষে জনসাধারণের অভাব-অভিযোগের প্রতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার সুযোগ-সুবিধা। 

৪. সুষ্ঠু শাসন ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তা। 

৫. পূর্ব বাংলার শিক্ষিত ও সভ্য লোকদের সংস্পর্শে আসায় অনুন্নত আসামের অধিবাসীদের উপকার। 

৬. পূর্ব বাংলার জন্য কর্মদক্ষ পুলিশ বাহিনী গঠন। 

৭. বাংলা প্রদেশে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি সাধন। 

৮. দেশের জনসাধারণ প্রদেশের প্রধান কর্মকর্তার সংস্পর্শে আসতে সক্ষম হয়।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, বঙ্গভঙ্গের উদ্যোগ প্রথমে ছিল প্রশাসনিক পরে রাজনৈতিক কারণেই প্রাধান্য লাভ করে। বঙ্গভঙ্গ বাংলার জনগণের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ ছিল। এর ফলে বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধিত হয়। বঙ্গভঙ্গ ও এর রদ মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে। মুসলমানরা উপলব্ধি করে যে, ব্রিটিশ সরকারের হাতে মুসলমানদের অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকতে পারে না। বঙ্গভঙ্গ ও এর রদ বাংলার মানুষকে বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে এবং নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে শিক্ষা দেয়।

প্রশ্ন ৷৷৩.০২৷৷ বঙ্গভঙ্গ কী? এর পরিপ্রেক্ষিতে হিন্দু-মুসলমান প্রতিক্রিয়া আলোচনা কর। অথবা, বঙ্গভঙ্গ কী? এতে হিন্দু-মুসলমানদের মনোভাব বিশ্লেষণ কর। অথবা, বঙ্গভঙ্গ বলতে কী জান? এর ফলে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল তা বর্ণনা কর।

উত্তর : ভূমিকা : ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে সংগঠিত বঙ্গভঙ্গ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। প্রশাসনিক কাজের সুবিধার কথা বিবেচনা করে তদানীন্তন বড় লাট লর্ড কার্জন সমগ্র বাংলা প্রদেশকে দুটি ভাগে ভাগ করেন যা ইতিহাসে বঙ্গভঙ্গ হিসেবে পরিচিত। বঙ্গভঙ্গের ফলে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। স্বাভাবিকভাবে পূর্ব বাংলায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকায় মুসলমানরা বঙ্গভঙ্গকে স্বাগত জানায় অপরদিকে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকায় এবং বঙ্গভঙ্গের ফলে তাদের প্রাধান্য হ্রাস পাওয়ার আশায় হিন্দুরা বঙ্গভঙ্গের চরম বিরোধিতা করে।

❑ বঙ্গভঙ্গ : উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ প্রদেশ ছিল 'বাংলা প্রেসিডেন্সি'। এটি বাংলা, বিহার, ছোট নাগপুর ও উড়িষ্যা নিয়ে গঠিত ছিল। বাংলা প্রেসিডেন্সির শাসনভার ছিল একজন গভর্নর বা ছোট লাটের উপর। কিন্তু তার একার পক্ষে শাসন পরিচালনা করা কষ্টকর ছিল। এমতাবস্থায় বড়লাট লর্ড কার্জন বাংলা প্রেসিডেন্সি বিভক্ত করার পরিকল্পনা করেন। এই লক্ষ্যে তিনি পূর্ববঙ্গ পরিদর্শনে আসেন এবং বঙ্গভঙ্গের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। তারই নির্দেশে বাংলা প্রদেশকে দুটি প্রদেশে বিভক্ত করা হয়। একটি হলো ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বিভাগ ও আসাম নিয়ে 'পূর্ববঙ্গ ও আসাম' প্রদেশ, যার রাজধানী করা হয় ঢাকাকে। অন্যটি হলো পশ্চিম বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে পশ্চিম বাংলা প্রদেশ। এর রাজধানী কলকাতাতেই থেকে যায়। 'পূর্ববঙ্গ ও আসাম' প্রদেশের গভর্নর নিযুক্ত হন স্যার জোসেফ ব্যামফিল্ড ফুলার এবং পশ্চিমবঙ্গের গভর্নর হন স্যার এন্ড্রু ফ্রেজার। দুইটি সম্পূর্ণ নতুন প্রদেশ সৃষ্টিতে বাংলা প্রদেশের হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায় বিপরীত প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে। মুসলমানরা বঙ্গভঙ্গকে স্বাগত জানায় এবং হিন্দুরা এর বিরোধিতা করে।

❑ বঙ্গভঙ্গের ফলে হিন্দু-মুসলমানের প্রতিক্রিয়া : ১৯০৫ সালে ঘোষিত বঙ্গভঙ্গের ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়। নিম্নে বঙ্গভঙ্গের ফলে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

১. মধ্যবিত্ত বাঙালি হিন্দু ও বর্ণ হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া : মধ্যবিত্ত ও উচ্চ বর্ণের হিন্দুসম্প্রদায় ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর থেকেই এর বিরোধিতা শুরু করে। কলকাতাকেন্দ্রিক সকল শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা বিশেষ করে জমিদার, রাজনীতিবিদ, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, আইনজীবী ও সাংবাদিক সবাই বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেয়। তারা বঙ্গভঙ্গকে জাতীয় সংহতি ও রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতি আঘাত বলে অভিহিত করেন। হিন্দু নেতৃবৃন্দ একে বাঙালি বিরোধী, জাতীয়তাবাদ বিরোধী ও বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদ প্রভৃতি বিশ্লেষণে আখ্যায়িত করেন। তারা মনে করেন এর দ্বারা মুসলমানদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হবে এজন্য যেকোনো মূল্যে হিন্দু সম্প্রদায় বঙ্গভঙ্গকে রুখে দিতে সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন এবং তাদের দাবির মুখে ১৯১১ সালে মাত্র ৬ বছরের মাথায় ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।

২. মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া : বাংলার মুসলমানরা বঙ্গভঙ্গকে স্বাগত জানান। এটি ছিল এ অঞ্চলের মানুষের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। ১৯০৫ সাল থেকে যখন হিন্দু সম্প্রদায় বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন গড়ে তোলে তখন ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ বঙ্গভঙ্গের পক্ষে মুসলিম জনমত গঠনে ভূমিকা রাখেন। মুসলিম নেতৃবৃন্দ লক্ষ করলেন যে, হিন্দু নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস কখনো মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার জন্য কাজ করবে না। এজন্য ১৯০৬ সালে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ গঠন করা হয়। বঙ্গভঙ্গের ফলে বাংলায় আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে। ঢাকা নতুন প্রদেশের রাজধানী হওয়ায় সেখানে অফিস-আদালত ও সুরম্য অট্টালিকা গড়ে উঠে। বিভিন্ন শিল্পকারখানা স্থাপন করা হয়। শিক্ষা-দীক্ষায় ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। বলতে গেলে ঢাকা কলকাতার সমকক্ষতা অর্জন করে। বাংলার সামগ্রিক উন্নতির ফলে বাংলার জনসাধারণ বঙ্গভঙ্গকে সাদরে গ্রহণ করেন।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, লর্ড কার্জন কর্তৃক ঘোষিত বঙ্গভঙ্গ যেমন মুসলমান সম্প্রদায়কে আনন্দিত করে ঠিক তেমনিভাবে হিন্দু সম্প্রদায়কে ব্যথিত করে তোলে। কারণ বঙ্গভঙ্গের ফলে রাজধানী হিসেবে কলকাতার গুরুত্ব কমে যায় এবং হিন্দুরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। অপরদিকে মুসলমানরা আর্থিক সচ্ছলতাসহ রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে উঠে। নিজেদের দাবি ও অধিকার সংরক্ষণের জন্য সোচ্চার হয়। বঙ্গভঙ্গ ও এর রদ বাঙালির মধ্যে মুসলিম জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটায় এবং স্বতন্ত্র জাতিসত্তা হিসেবে বাঙালি মুসলমানদের আত্মপ্রকাশে বঙ্গভঙ্গ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

প্রশ্ন ৷৷৩.০৩৷৷ বঙ্গভঙ্গের পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাবলির ওপর এর প্রভাব আলোচনা কর। অথবা, বঙ্গভঙ্গের ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে কী প্রভাব পড়েছিল? ব্যাখ্যা কর। অথবা, বঙ্গভঙ্গের পরবর্তী রাজনৈতিক পরিক্রমা বিশ্লেষণ কর।

উত্তর : ভূমিকা : ব্রিটিশ ভারতের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে লর্ড কার্জন কর্তৃক ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ঘোষিত বঙ্গভঙ্গ আইন এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য যুগান্তকারী ঘটনা। বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ব বঙ্গ ও পশ্চিম বঙ্গ নামে নতুন দুটি প্রদেশ গড়ে উঠে। নতুন দুই প্রদেশের রাজধানীকে ঘিরে ঢাকা ও কলকাতা কেন্দ্রিক রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতি পরিচালিত হতে থাকে। বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ব বঙ্গের জনগণ রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে উঠে এবং সেখানে আর্থিক ও অবকাঠামোগত অনেক উন্নয়ন সাধিত হয়। অপরদিকে, পশ্চিম বঙ্গের জনগণ বিশেষ করে রাজনীতিবিদরা এর বিরুদ্ধাচরণ করে, যার ফলে রাজনীতিতে হিন্দু ও মুসলিম জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে। যার ফলশ্রুতিতে আমরা দেখতে পাই মুসলমানরা কংগ্রেসের প্রতি আস্থা হারায় এবং মুসলিম লীগকে নিজেদের অধিকার আদায়ের প্লাটফর্ম হিসেবে বেছে নেয়।

❑ বঙ্গভঙ্গের পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাবলির ওপর এর প্রভাব : ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আইন ভারতের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। নিম্নে রাজনৈতিক ঘটনাবলির উপর বঙ্গভঙ্গের প্রভাব বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :

১. রাজনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি : ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ও নতুন প্রদেশ গঠন পূর্ব বাংলার মুসলিম সমাজ ও রাজনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। ঢাকা নতুন প্রদেশের রাজধানী হওয়ায় ঢাকায় উন্নয়নের ছোঁয়া লাগে। ঢাকায় গড়ে উঠে নতুন অফিস, সচিবালয়, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পকারখানা। জনগণ রাজনীতিসচেতন হয়ে উঠে।

২. মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া : বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা বিরোধিতা করলে মুসলমান নেতৃবৃন্দ হিন্দুদের আন্দোলনের বিরুদ্ধে একটি প্রতি আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য সমাজের বিভিন্ন স্তরের মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে পূর্ব বাংলার মুসলমান সম্প্রদায় সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে পদার্পণ করে। সর্বস্তরের বাঙালি মুসলিম সমাজে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরিতে বঙ্গভঙ্গ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

৩. হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া : বঙ্গভঙ্গের আলাপ-আলোচনা শুরুর থেকেই হিন্দুরা এর চরম বিরোধিতা করে আসছিল। এর অন্যতম কারণ ছিল তাদের প্রাধান্য হ্রাস ও মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি। হিন্দুরা কংগ্রেসকে রাজনৈতিক প্লাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করে বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। যার ফলে কংগ্রেস থেকে মুসলমানদের আস্থা উঠে যায় এবং এটি একটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনে রূপ নেয়।

৪. কংগ্রেসের সংকীর্ণমনা : ১৮৮৫ সালে সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দল হিসেবে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল ভারতের জনগণের দাবিদাওয়া ভারত সরকারের নিকট তুলে ধরে অধিকার আদায়ে সর্বদা সোচ্চার থাকবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো কংগ্রেস নিরপেক্ষভাবে কার্যসম্পাদন করতে পারেনি। এটি পরিণত হয় একটি হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক সংগঠনে। যার প্রতিফলন আমরা দেখি বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে কংগ্রেস নেতারা প্রকাশ্যে আন্দোলনে নামেন।

৫. রাজনৈতিক বিভাজন : ব্রিটিশ সরকারের বঙ্গভঙ্গ আইন প্রণয়নের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে নস্যাৎ করে দেওয়া। বঙ্গভঙ্গের ফলে ঢাকা ও কলকাতা কেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্লাটফর্ম তৈরি হওয়ায় ভারতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন স্থবির হয়ে পড়ে এবং ভারতে ব্রিটিশ শাসন আরো দীর্ঘদিনের জন্য পাকাপোক্ত হয়ে যায়।

৬. মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচন দাবি : বঙ্গভঙ্গ পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থা বলতে গেলে বাঙালি মুসলমানদের জন্য রাজনৈতিক রেনেসাঁর যুগ। ১৯০৬ সালে মুসলমানদের প্রথম রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা ও এটিকে ঘিরে বাংলার রাজনীতি আবর্তিত হতে থাকে। মুসলমানদের মধ্য থেকে অনেকে নেতৃত্বের গুণসম্পন্ন হয়ে উঠে। নবাব সলিমুল্লাহ মুসলিম লীগের কাণ্ডারীর ভূমিকা পালন করেন। মুসলমানদের পক্ষ থেকে পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করার দাবি জানানো হয়। মুসলিম লীগের চাপের মুখে মর্লে-মিন্টো ১৯০৯ সালে মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচন ও প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করেন।

৭. হিন্দু-মুসলিম ঐক্য : বঙ্গভঙ্গ ও এর রদ ভারতীয় হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে অনেক অনৈক্য সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে উভয় দলের নেতারা বুঝতে সক্ষম হলেন যে, হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য ভারতে ব্রিটিশ শাসনকে আরো দীর্ঘায়িত করবে। এজন্য দেশকে ব্রিটিশ শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে ১৯১৬ সালে ঐতিহাসিক 'লখনৌ চুক্তি' স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তির ফলে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

৮. মুসলিম লীগের স্বীকৃতি : ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠাকে ভারতীয় কংগ্রেস ভালো চোখে দেখেনি। কংগ্রেস সর্বদা মুসলিম লীগকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখত। কিন্তু লখনৌ চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে কংগ্রেস মুসলিম লীগকে ভারতের অন্যতম একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আর মুসলিম লীগও কংগ্রেসের সাথে একই কাতারে দাঁড়িয়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে।

৯. ভারত শাসন আইন : বঙ্গভঙ্গ ভারতে ব্রিটিশ রাজশক্তির শাসননীতি সংস্কারে অনন্য ভূমিকা পালন করে। ১৯০৯, ১৯১৯ ও ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন প্রভৃতি ছিল বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের ফসল। ব্রিটিশ সরকারের প্রণীত এসব সংস্কার আইন ধীরে ধীরে ভারতের স্বাধীনতা ঘোষণার দিকে ধাবিত করে।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ও ১৯১১ সালে এর রদ ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক প্রবাহকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। প্রথমে বঙ্গভঙ্গ ও এর রদ নিয়ে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে বিতর্ক তৈরি হলেও পরবর্তীতে পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে দুই সম্প্রদায়ই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।


অনার্স ১ম বর্ষ বাংলাদেশের ইতিহাস ভাষা সংস্কৃতি ও পরিচয় অধ্যায়-৩ উপনিবেশিক যুগ (২০শ শতকের প্রথমার্ধ) গাইড PDF

📥 PDF ডাউনলোড করুন

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!
Join